সৈয়দ মাহবুব হাসান আমিরী

আইসিটি বিভাগ, ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ

শিক্ষা

শিক্ষা, শিক্ষার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও মৌলিক শিক্ষার গুরুত্ত্ব

দার্শনিক ও শিক্ষাবিদ শিক্ষাকে বিভিন্নভাবে সংজ্ঞায়িত করেছেন। শিক্ষার উদ্দেশ্যে বর্ণনা করে গেছেন। প্রাচীন দার্শনিক এরিস্টোটল, সক্রেটিস ও প্লেপটো শিক্ষার তাৎপর্য বর্ণনা করে গেছেন। সেই থেকে পরবর্তী সকল যুগের চিন্তাবিদরাই শিক্ষা সম্পর্কে কথা বলেছেন। শিক্ষার পরিচয় এবং সংজ্ঞা দেবার চেষ্টা করেছেন।

পবিত্র আল কুরআন থেকে জানা যায়, নবীগণ শিক্ষা প্রচারের উদ্দেশ্যেরই প্রেরিত হয়েছিলেন। তাঁরা শিক্ষার তাৎপর্য এবং লক্ষ্য উদ্দেশ্য সুস্পষ্টভাবে নিজ নিজ জাতির সামনে পেশ করেছেন। সর্বেশেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও শিক্ষক হিসেবেই প্রেরিত হয়েছিলেন। তাঁর উপর অবতীর্ণ আল কুরআন এবং তাঁর নিজের বাণী হাদীস থেকে শিক্ষার তাৎপর্য এবং লক্ষ্য উদ্দেশ্য দিবালোকের মতো প্রতিভাত হয়।

শিক্ষা

এবার আমরা জানতে চেষ্টা করবো শিক্ষা কি? শিক্ষার সংজ্ঞা কি? তাৎপর্য কি? আর প্রকৃতপক্ষে শিক্ষা বলতে কি বুঝায়? প্রথমে কয়েকটি শব্দ ব্যাখ্যা করতে চাই। যেসব শব্দ ব্যবহার করে শিক্ষা বুঝানো হয় সেগুলোর বিশ্লেষণ শিক্ষার মর্ম বুঝার সহায়ক হবে। যেমন কোনো বস্তুকে বুঝতে হলে তার উপাদান বিশ্লেষণ করে দেখা একান্ত জরুরি।

ইংরেজি ভাষায় শিক্ষার প্রতিশব্দ হলো Education. Education শব্দের সাধারণ আভিধানিক অর্থ হলো : শিক্ষাদান ও প্রতিপালন, শিক্ষাদান, শিক্ষা। Educate মানে : to bring up and instruct, to teach, to train অর্থাৎ প্রতিপালন করা ও শিক্ষিত করিয়া তোলা, শিক্ষা দেওয়া, অভ্যাস করানো।

উইকিপিডিয়াতে দেখা যায় যে, Education in the largest sense is any act or experience that has a formative effect on the mind, character or physical ability of an individual. In its technical sense, education is the process by which society deliberately transmits its accumulated knowledge, skills and values from one generation to another. Etymologically, the word education is derived from educare (Latin) “bring up”, which is related to educere “bring out”, “bring forth what is within”, “bring out potential” and ducere, “to lead”. Teachers in educational institutions direct the education of students and might draw on many subjects, including reading, writing, mathematics, science and history. This process is sometimes called schooling when referring to the education of teaching only a certain subject, usually as professors at institutions of higher learning. There is also education in fields for those who want specific vocational skills, such as those required to be a pilot. In addition there is an array of education possible at the informal level, such as in museums and libraries, with the Internet and in life experience. Many non-traditional education options are now available and continue to evolve.

Joseph T. Shipley তাঁর Dictionary of word Origins এ লিখেছেন, Education শব্দটি এসেছে ল্যাটিন Edex এবং Ducer-Duc শব্দগুলো থেকে। এ শব্দগুলোর শাব্দিক অর্থ হলো, যথাক্রমে বের করা, পথ প্রদর্শন করা। আরেকটু ব্যাপক অর্থে তথ্য সংগ্রহ করে দেয়া এবং সুপ্ত প্রতিভা বিকশিত করে দেয়া।

একজন শিক্ষাবিদ লিখেছেন, Education শব্দের বুৎপত্তি অনুযায়ী শিক্ষা হলো শিক্ষার্থীর মধ্যকার ঘুমন্ত প্রতিভা বা সম্ভবনার পথ
আরেকজন শিক্ষাবিদ লিখেছেন :

Education denotes the realization of innate human potentialities of individuals through the accumulation of knowledge.

কুরআন হাদীস এবং আরবী ভাষায় শিক্ষার জন্যে যেসব পরিভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, সে শব্দগুলো এবার বিশ্লেষণ করে দেখা যাক। এ ক্ষেত্রে পাঁচটি শব্দের ব্যবহার সুবিদিত। সেগুলো হলো : ১. তারবীয়াহ (تربية) ২. তালীম (تعليم) ৩. তাদীব (تأديب) ৪. তাদরীব (تدريب) ৫. তাদরীস (تدريس) ।

এই শব্দগুলোর আভিধানিক অর্থ নিন্মরূপ :

تربية শব্দটি নির্গত হয়েছে ربو শব্দ থেকে। ربو মানে : Increase, to grow. to grow up, to exceed, to raise, rear, bring up, to educate, to teach, instruct, to bread, to develop, augment.

আর تربية মানে : Education, up bringing Instruction, Pedagogy, Breeding, Raising.

تعليم শব্দটি গঠিত হয়েছে علم থেকে। তালীম (تعليم) মানে : Information, Advice, Instruction, Direction, Teaching, Training, Schooling, Education, Apprenticeship.

تأديب [তাদীব] শব্দটি গঠিত হয়েছে أدب [আদব] শব্দ থেকে। আদব (أدب) মানে : Culture, Refinement, Good breeding, Good, manners, Social graces, Decorum. এ অর্থবহ أدب [আদব] শব্দটি থেকেই গঠিত হয়েছে تأديب শব্দ। তাই তাদীব শব্দের মধ্যে একদিকে যেমন এই সব অর্থও নিহিত রয়েছে, অন্যদিকে তাদীব দ্বারা Education এবং Discipline ও বুঝায়।

تدريب [তাদরীব] মানে : Habitation, Accustoming, Practice, Drill, Schooling, Training, Coaching, Tutoring.

تدريس [তাদরীস] শব্দটি গঠিত হয়েছে درس [দারস্] শব্দ থেকে। তাদরীস মানে : To study, to learn, to teach, to instruct, to wipe out, to blot out, to thrash out, tution.

আভিধানিক অর্থ থেকেই পরিষ্কার হলো, এই পরিভাষাগুলো ব্যাপক অর্থবোধক। বিশেষ করে প্রথম ও দ্বিতীয় শব্দদ্বয় অত্যন্ত প্রশস্ত ভাব বাঞ্চনাময়। তৃতীয় শব্দটি ব্যবহৃত হয় বিশেষভাবে আচরণগত সুশিক্ষাদান অর্থে। চতুর্থ শব্দটি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কাংখিত অভ্যাস গড়ে তোলা অর্থে ব্যবহৃত হয়। পঞ্চম শব্দটি ব্যবহৃত হয় পঠন, পাঠন, শিক্ষাদান, পাঠদান এবং শিক্ষাদানের মাধ্যমে অনাকাংখিত অভ্যাস ও অবস্থা দূরীকরণ অর্থে।

আরবী ও ইসলামী পরিভাষায় শিক্ষার জন্যে যে শব্দগুলো ব্যবহৃত হয়, এ হলো সেগুলোর বাংলা অর্থ ও মর্ম। এর মধ্যে একেবারে পাঠদান ও পাঠগ্রহণ থেকে আরম্ভ করে মানসিক, আত্মিক, নৈতিক ও শারীরিক পরিপূর্ণ বিকাশ উন্নয়ন, পরিশীলতা ও দক্ষতা অর্জনের ব্যাপকতা রয়েছে। শিক্ষাবিদ, দার্শনিক ও মনীষীদের মতামত আলোচনা করলেও দেখা যায়, তাঁদের কেউ কেউ শিক্ষার খুব সংকীর্ণ অর্থ করেছেন। আবার কারো কারো দৃষ্টিতে শিক্ষার পরিচয় পরিধি অত্যন্ত ব্যাপক। মূলত শিক্ষা মানুষের পূরো জীবন পরিব্যপ্ত। দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত শিক্ষার ব্যাপকতা পরিব্যাপ্ত। মানুষ তার পূর্ণাঙ্গ জীবনে যা কিছুই আহরণ করে, আত্মস্থ করে, তা শিক্ষার মাধ্যমেই করে। যে কোনো জ্ঞানার্জনের মাধ্যমই হলো শিক্ষা।

শিক্ষার উদ্দেশ্য

প্রথমেই দেখা যাক, শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে মনীষীরা কে কি বলেছেন :
জন ডিউই বলেছেন, ‌‍‌‌”শিক্ষার উদ্দেশ্য আত্ম উপলদ্ধি।‍”
প্লেটোর মত হলো, “শরীর ও আত্মার পরিপূর্ণ বিকাশ ও উন্নতির জন্য যা কিছু প্রয়োজন, তা সবই শিক্ষার উদ্দেশ্য অন্তর্ভূক্ত”।
প্লেটোর শিক্ষক সক্রেটিসের মতে, “শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো মিথ্যার বিনাশ আর সত্যের আবিষ্কার”
এরিস্টোটল বলেছেন : শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্যে হলো ধর্মীয় অনুশাসনের অনুমোদিত পবিত্র কার্যক্রমের মাধ্যমে সুখ লাভ করা।
শিক্ষাবিদ জন লকের মতে, শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে সুস্থ দেহে সুস্থ মন প্রতিপালনের নীতিমালা আয়ত্বকরণ।
বিখ্যাত শিক্ষাবিদ হার্বার্ট বলেছেন : শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে শিশুর সম্ভবনা ও অনুরাগের পূর্ণ বিকাশ ও তার নৈতিক চরিত্রের প্রকাশ।
কিন্ডার গার্টেন পদ্ধতির উদ্ভাবক বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ফ্রোয়েবেল এর মতে : শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে সুন্দর বিশ্বাসযোগ্য ও পবিত্র জীবনের উপলব্ধি।
কমেনিয়াসের মতে : শিশুর সামগ্রিক বিকাশই শিক্ষার উদ্দেশ্য হওয়া উচিত। আর মানুষের শেষ লক্ষ্য হবে সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্যে সুখ লাভ করা।
পার্কার বলেছেন : পূর্ণাঙ্গ মানুষের আত্ম প্রকাশের জন্যে যেসব গুনাবলী নিয়ে শিক্ষার্থী এ পৃথিবীতে আগমন করেছে, শিক্ষার উদ্দেশ্য হবে সেসব গুনাবলীর যথাযথ বিকাশ সাধন।
জীন জ্যাক রুশোর মতে : সুঅভ্যাসে গড়ে তোলাই শিক্ষার উদ্দেশ্য।
Bartrand Russell এর মন্তব্য হলো :
…….The education system we must aim at producing in the future is one which gives every boy and girl an opportunity for the best that exists.
স্যার পার্সীনান বলেছেন : শিক্ষার উদ্দেশ্য হলো : চরিত্র গঠন, পরিপূর্ণ জীবনের জন্য প্রস্তুতি এবং ভালো দেহ ভালো মন গড়ে তোলা।
ডা: হাসান জামান বলেছেন :প্রত্যয় দীপ্ত মহত জীবন সাধনায় সঞ্জিবনী শক্তি সঞ্চার করাই শিক্ষার উদ্দেশ্য।
ড: খুরশীদ আহমেদের মতে : স্বকীয় সংস্কৃতি ও আদর্শের ভিত্তিতে সুনাগরিক তৈরি করা………এবং জাতির ধর্ম ও সংস্কৃতিক সংরক্ষণ ও উন্নয়ন হওয়া উচিত শিক্ষার উদ্দেশ্য।
আল্লামা ইকবালের মতে : পূর্ণাংগ মুসলিম তৈরি করাই হবে শিক্ষার উদ্দেশ্য।

বিখ্যাত দার্শনিক ও ইসলামী চিন্তাবিদ সাইয়েদ মওদূদী বলেন :

মানুষ কেবল চোখ দিয়েই দেখেনা, এর পেছনে রয়েছে তার সক্রিয় মন ও মগজ। রয়েছে তার একটা দৃষ্টিভংগি ও মতামত। জীবনের একটা উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য আছে তার। সমস্যাবলী নিয়ে চিন্তা ভাবনা করার একটা প্রক্রিয়া তার আছে। মানুষ যা কিছু দেখে, শুনে এবং জানে, সেটাকে সে নিজের অভ্যন্তরীণ মৌলিক চিন্তা ও ধ্যান ধারণার সাথে সামঞ্জস্যশীল করে নেয়। অতপর সেই চিন্তা ও ধ্যান ধারণার ভিত্তিতেই তার জীবন পদ্ধতি গড়ে উঠে। এই জীবন পদ্ধতিই হলো সংস্কৃতি। যে জাতি একটা স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, আকিদা বিশ্বাস ও উদ্দেশ্য লক্ষ্যর অধিকারী এবং যাদের রয়েছে নিজস্ব জীবনাদর্শ, তাদেরকে অব্যশ্যি তাদের নতুন প্রজন্মকে সেই স্বতন্ত্র সংস্কৃতি, আকিদা বিশ্বাস, উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ও জীবনাদর্শের রক্ষণাবেক্ষণ এবং তার বিকাশ ও উন্নয়নের যোগ্য করে গড়ে তোলা কর্তব্য। আর সে উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করেই গড়ে তুলতে হবে তাদের শিক্ষা ব্যবস্থা।

শিক্ষার লক্ষ্য

১. শরিক রাষ্ট্রসমূহ এ ব্যাপারে সম্মত যে, শিশুদের দিক্ষা দানের ক্ষেত্রে লক্স্য থাকবে-
ক. শিশুর ব্যক্তিত্ব, মেধা এবং মানসিক ও শারীরিক সামর্থের পরিপূর্ণ বিকাশ;
খ. মানবাধিকার ও মৌলিক অধিকার এবং জাতিসংঘ ষোষণায় বর্ণিত নীতিমালার প্রতি শ্রদ্ধাবোধের বিকাশ :
গ. শিশুর পিতা-মাতা তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক সত্তা, ভাষা ও মূল্যবোধ, তার মাতৃভূমি এবং অপরাপর সভ্যতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধের বিকাশ :
ঘ. সমঝোতা, শান্তি, সহিষ্ণুতা, নারী-পুরুষের সমানাধিকার এবং সকল মানুষ নৃ-গোষ্টী, জাতীয় ও ধর্মীয় গোষ্ঠী এবং আদিবাসী লোকজনের মধ্যে মৈত্রীর চেতনার আলোকে একটি মুক্ত সমাজে দায়িত্বশীল জীবনের জন্য শিশুর প্রস্ততি :
ঙ. প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের বিকাশ।

এই অনুচ্ছেদের বিশ্লেষণের করলে দেখা যায়, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের দৃষ্টিতে শিশুর লক্ষ্য হলো :

‌১. ব্যক্তিত্বের পরিপূর্ণ বিকাশ:
২. মেধার পরিপূর্ণ বিকাশ;
৩. মানসিক শক্তির পরিপূর্ণ বিকাশ;
৪. শারীরিক সামর্থের পরিপূর্ণ বিকাশ;
৫. মানবাধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের বিকাশ;
৬. মৌলিক অধিকারের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের বিকাশ;
৭. জাতিসংঘ ঘোষণার বর্ণিত নীতিমালার প্রতি শ্রদ্ধাবোধের বিকাশ;
৮. পিতা-মাতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধের বিকাশ;
৯. নিজস্ব সাংস্কৃতিক সত্তার প্রতি শ্রদ্ধাবোধের বিকাশ;
১০. নিজস্ব ভাষার প্রতি শ্রদ্ধাবোধের বিকাশ;
১১. নিজস্ব মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের বিকাশ;
১২. মাতৃভূমির প্রতি শ্রদ্ধাবোধের বিকাশ;
১৩. অপরাপর সভ্যতার প্রতি শ্রদ্ধাবোধের বিকাশ;
১৪. সমঝোতা, শান্তি, সহিষ্ণুতা, নারী-পুরুষের সমানাধিকার এবং সকল মানুষ. নৃ-গোষ্ঠী, জাতীয় ও ধর্মীয় গোষ্ঠ এবং আদিবাসী লোকজনের মধ্যে মৈত্রীর চেতনার আলোকে একটি মুক্ত সমাজে দায়িত্বশীল জীবনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ;
১৫. প্রাকৃতিক পরিবেশের প্রতি শ্রদ্ধাবোধের বিকাশ।

মৌলিক শিক্ষার গুরুত্ব

শিক্ষা একটি মৌলিক মানবাধিকার। একটি দক্ষ, মর্যাদাবান ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের জন্য শিক্ষার বিকল্প নেই। আমাদের গৌরবময় মুক্তিযুদ্ধের পর থেকে আমাদের শিক্ষা ক্ষেত্রে অর্জন আছে অনেক। কিন্তু বিশ্বায়নের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম ও মূল্যবোধসম্পন্ন জাতি গঠনের মত শিক্ষা আমরা এখনও অর্জন করতে পারিনি। সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের যথাযথ দায়িত্ব পালন না করা এবং প্রান্তিক মানুষেরা দারিদ্র্যের রাহুচক্রে আবদ্ধ হওয়ার ফলে শিক্ষার অধিকার লংঘিত হচ্ছে। শিক্ষার কাঙ্খিত মান অর্জিত হচ্ছে না। আমাদের সামনে রয়েছে সহস্রাব্দের লক্ষ্যমাত্রা: ২০১৫ সালের মধ্যে সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। শিক্ষা নিয়ে আমাদের দেশে গবেষণা হচ্ছে অনেক; এ নিয়ে আগ্রহ উদ্দীপনার কমতি নেই। অংশভাগী জনসমাজকে সাথে নিয়ে শিক্ষা ক্ষেত্রে সমস্যার প্রকৃতি পর্যালোচনা করে করণীয় নির্ধারণ করতে হবে আমাদের সরকারকে।

উইকিপিডিয়াতে লিখা আছে যে, Basic education refers to the whole range of educational activities taking place in various settings (formal, non formal and informal), that aim to meet basic learning needs. According to the International Standard Classification of Education (ISCED), basic education comprises primary education (first stage of basic education) and lower secondary education (second stage). In countries (developing countries in particular), Basic Education often includes also pre-primary education and/or adult literacy programs.

গুনগত মানসম্মত শিক্ষাঃ শুধু মৌলিক শিক্ষা অর্জন করলেই চলেনা। সেটি গুনগত মানসম্পন্ন না হলে মৌলিক শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য ব্যাহত হতে বাধ্য। মানসম্মত শিক্ষা হলো সে শিক্ষাব্যবস্থা যেখানে শিক্ষার্থীকে সময়মত তার পর্যাপ্ত শিক্ষা উপকরণসহ শিক্ষা লাভের ব্যবস্থা করে দেওয়া হয়। শিক্ষা যদি মানসম্মত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে অর্জন করা না যায় তাহলে অর্জিত শিক্ষা যেমন স্থিতিশীল হতে পারে না তেমনি জীবনব্যপি দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রেও ঘাটতি থেকে যায়। কাজেই বর্তমানে মানসম্মত শিক্ষার ধারণাটি খুবই গুরুত্ব বহন করে। “সবার জন্য শিক্ষা”ও “শিক্ষার সহস্রাব্দের উন্নয়ন লক্ষ্য” বলতে গুনগত মানসম্মত শিক্ষাকে বোঝানো হয়ে থাকে।

শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা : আমাদের জনগোষ্ঠির বিরাট অংশই শিক্ষার মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। শিশুদের কেউ কেউ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারে না। অনেক গ্রামে স্কুল নেই। প্রাথমিক পর্যায়ের শিশুদের বিদ্যালয়ে অর্ন্তভুক্তির হার ৮২.৭ শতাংশ এবং মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এ হার ৬৫ শতাংশ। যারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায় তাদের বেশির ভাগ প্রয়োজনীয় শিক্ষা উপকরণ পায় না, শিক্ষকের স্বল্পতার কারণে বিদ্যালয়ে ঠিকমত ক্লাস করতে পারেনা এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও শিক্ষা উপযোগী পরিবেশের অভাবে শিশুরা বাড়িতে পড়ালেখা করতে পারেনা। আমাদের দেশের অধিকাংশ দরিদ্র ও নিরক্ষর অভিভাবকদের কথা বিবেচনায় রেখে শিশুদের পুষ্টি চাহিদা পূরণ করে বিদ্যালয় কেন্দ্রিক ও আকর্ষনীয় শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। তীব্র বর্ষায় স্কুলের কার্যক্রম স্থবির হয়ে যায়। আবার অনেক শিশু বিশেষ মৌসুমে দরিদ্র পরিবারকে আয়মূলক কাজে সাহায্য করে। এসব সমস্যার কথা বিবেচনায় রেখে স্থানীয় পর্যায়ে স্কুল সময়সূচী নির্ধারিত হয়নি। ফলে যারা সার্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করতে পারে তাদের হার মাত্র ৬৭ শতাংশ।

শিক্ষার সংবিধান স্বীকৃত অধিকারঃ শিক্ষা ক্ষেত্রে প্রান্তিক ও গরীব শিশুরা বঞ্চনার শিকার হয়। এর মধ্যে মেয়ে শিশুরা আবার বঞ্চনার শিকার হচ্ছে বেশি। রাষ্ট্রের উচ্চ থেকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর অভ্যন্তরে শিক্ষার অধিকার লংঘিত হচ্ছে। অধিকার লংঘিত হচ্ছে দু’ভাবে। একটি হলো দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি তাদের করণীয় যথাযথভাবে সম্পন্ন না করে বা করতে প্রতিবন্ধকতা তৈরী করে। অপরটি হলো অধিকারভোগিরা যদি তাদের অধিকারের দাবী না তোলে। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে বাধ্যবাধকতা অনুসরণে ১৯৯০ সালে প্রাথমিক শিক্ষা ( বাধ্যতামূলক) আইন প্রণয়নের মাধ্যমে দেশে প্রাথমিক শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বজনীন করার লক্ষ্যে ১৯৯২ সালে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা বিভাগে ও ১৯৯৩ সালে সারা দেশে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা কর্মসূচী চালু করা হয়। এ আইনে ইউনিয়ন ও পৌর সভার প্রতিটি ওয়ার্ডে বাধ্যতামূলক প্রাথমিক শিক্ষা কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে যারা এলাকার শিশুদের সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়ে আগমন নিশ্চিত করবেন। এ আইনে শিশুকে বিদ্যালয়ে যাওয়া থেকে বিরত করা অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এ জন্য পিতা-মাতা বা অভিভাবক এবং প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দায়ী হবেন। এছাড়া শিশুর বিদ্যালয়ে অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করে এমন কোন কাজে শিশুকে নিয়োগ করলে সেটিও আইনত অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে এবং এজন্য নিয়োগকারী দায়ী হবেন। ১৯৪৮ সালে জাতিসংঘের বিশ্ব মানবাধিকার ঘোষণায় স্পস্ট ভাষায় বলা হয়েছে,“প্রত্যেক মানুষের শিক্ষার অধিকার রয়েছে।” জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার এ ঘোষণার প্রতি পূর্ণ সমর্থন ব্যক্ত করে এটি বাস্তবায়নে অঙ্গীকারাবদ্ধ হয়েছে।

যা করা দরকারঃ সহস্রাব্দের লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০১৫ সালের মধ্যে ছেলে-মেয়ে নির্বিশেষে সকল শিশু যাতে মানসম্মতভাবে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করতে পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটের কথা বিবেচনায় রেখে মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল এর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে। এজন্য স্বল্প মেয়াদি ও দীর্ঘ মেয়াদি বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। এ লক্ষ্যে প্রথমে দৃষ্টি দেওয়া দরকার গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র বা পিআরএসপি’র দিকে; এতে বলা হয়েছে দারিদ্র্যর রাহুগ্রাসমুক্ত করে সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা কর্মসূচীকে অবিলম্বে কাঙ্খিত লক্ষ্যে নিয়ে যেতে স্কুল শিশুদের দুপুরের খাবার কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা দরকার। এ ছাড়া আরো যা করা দরকারঃ
• বিদ্যালয়ে সকল শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে স্থানীয় ভিত্তিতে বিদ্যালয় সময়সূচী নির্ধারণ করা
• সকলের প্রবেশাধিকার, স্কুলে টিকে থাকা এবং বিষয়গত ধারনা অর্জনের পর্যাপ্ত সুযোগ থাকতে হবে
• শিশু, তরুন ও প্রাপ্ত বয়স্কদের শিখন চাহিদা পূরণে পদক্ষেপ গ্রহণ করা
• একটি প্রযুক্তি নির্ভর ও জ্ঞান ভিত্তিক শিখন সহায়ক সামাজিক পরিবেশ তৈরী করা।
• মৌলিক শিক্ষার আনুষ্ঠানিক ও উপানুষ্ঠানিক উভয় ধারায় কোন রকম বৈষম্য ছাড়া কর্মসূচী বাস্তবায়ন করা
• শিশুদের জন্য প্রাক-শৈশবকালীন যতœ ও শিক্ষা বিষয়ে সুসংগঠিত, সমন্বিত কর্মসূচী নেয়া
• সকল প্রাথমিক শিক্ষা উপযোগী বয়সের শিশু বিশেষ করে মেয়েশিশু, প্রতিবন্ধীশিশু সহ সংখ্যা লঘু জাতি-গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করে তাদেরকে মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার জন্য সক্ষম করে তোলা
• তরুন ও প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য যথাযথ শিখন কর্মসুচী প্রনয়ন করা এবং সকলের অংশগ্রহণ ও সফল সমাপ্তি নিশ্চিত করা
• বয়স্ক সাক্ষরতার হার বাড়ানো
• মৌলিক শিক্ষার সর্বক্ষেত্রে সর্বজন স্বীকৃত ও পরিমাপযোগ্য শিখন ফলাফল নিশ্চিত করা
• মৌলিক শিক্ষার আনুষ্ঠানিক ও উপানুষ্ঠানিক ধারার মধ্যে সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করা।

তথ্যসূত্রঃ
১. স্বপন কুমার ঢালী – শিক্ষার ভিত্তি
২. ডঃ মোঃ আবদুল আউয়অল খান – শিক্ষার ভিত্তি
৩. মোঃ আবদুস সামাদ – তুলনামূলক শিক্ষা
৪. মোঃ মনিরুজ্জামান – আবশ্যকীয় শিক্ষণ দক্ষতা
৫. মোহাম্মদ মুজিবুর রহমান – শিক্ষা মনোবিজ্ঞান ও নির্দেশনা
৬. রওশন আরা চৌধুরী – শিক্ষা ও অর্থনীতি
৭. ডঃ কমরুন্নেসা – প্রাথমিক শিক্ষাঃ বাংলাদেশ
৮. বিভিন্ন ওয়েবসাইট

LEAVE A RESPONSE

Your email address will not be published. Required fields are marked *