সৈয়দ মাহবুব হাসান আমিরী

আইসিটি বিভাগ, ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ

গবেষণা

কর্মসহায়ক গবেষণা

অধুনিক শিক্ষা গবেষণায় ব্যবহৃত একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি হচ্ছে কর্মসহায়ক গবেষণা (Action Research)।শিক্ষা গবেষণা কার্যক্রমে কর্মসহায়ক গবেষণা একটি নতুন বৈজ্ঞানিক ও প্রয়োগিক পদ্ধতি এবং নতুন ধারা সংযোজন করেছে।সাত দশক পূর্বে ১৯৪৪ সালে কর্মসহায়ক গবেষণা আত্মপ্রকাশ করেছিল।প্র্রথম থেকেই এই গবেষণা পদ্ধতি বাস্তব জগতের প্রয়োজন ও সমস্যা নিয়ে গবেষণা করেছে এবং ঐ সব সমস্যা সমাধানের বাস্তবমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করায় অতিদ্রুত তা জনপ্রিয় হয়ে উঠে।কর্মসহায়ক গবেষণার দুটি উদ্দেশ্য হচ্ছে সমস্যার সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের দিক নির্দেশনা দেয়া এবং সামাজিক বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য অর্জনে সহায়তা করা। আর তাই সমাজের পরিবর্তনের জন্য নতুন পথের সন্ধান কর্মসহায়ক গবেষণা দিয়ে থাকে। ১৯৪৪ সালে কার্ট লিওন কর্মসহায়ক গবেষণাকে ব্যবহার করেন তত্ত্ব ও প্রয়োগের মধ্যে সেতুবন্ধন হিসেবে।তিনি কার্য ও গবেষণাকে একত্রিত করেন যা সমাজের প্রকৃত অবস্থা অনুধাবন করতে সক্ষম হয়।

কর্মসহায়ক গবেষণা
কর্মসহায়ক গবেষণা হল এক ধরনের প্রায়োগিক গবেষণা। কোন ব্যক্তি তার পেশাগত কাজে কোন সমস্যার সম্মুখীন হলে সেই সমস্যার সমাধানের জন্য যে গবেষণা পরিচালনা করেন তাই কর্মসহায়ক গবেষণা।এই গবেষণায় গবেষক নিজেই এই সমস্যার সম্মুখীন। পেশাগত অনুশীলন ছাড়াও বিভিন্ন সামাজিক সমস্যা নিয়েও এ গবেষণা পরিচালনা করা যায়।
কর্মসহায়ক গবেষণার সংজ্ঞা: কর্মসহায়ক গবেষণা সম্পর্কে বিভিন্ন মনীষীদের সংজ্ঞা নিচে দেয়া হল-
• “কর্মসহায়ক গবেষণা হল পুনরায় সামাজিক কার্যক্রমের জন্য গবেষণা ব্যবহারের এমন একটি পদ্ধতি যা কোন সমস্যা সমাধান এবং প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানের জন্য কিছু সংখ্যক লোক সংঘবদ্ধ হতে পারে এমনভাবে যেন গবেষণা নিজেই ক্ষমতা অর্পণ এবং কার্যক্রম পরিচালনার অংশ হিসেবে কাজ করতে পারে।”-পালমার ও জনসন।
• “কর্মসহায়ক গবেষণার মৌলিক অনুমান হচ্ছে সমাজের চলিত রীতি বা অভ্যাস পরিবর্তনের ফলাফল অন্যের দ্বারা নিরীক্ষার চেয়ে স্বয়ং নিরীক্ষা বেশি সম্ভাব্য।”-কুক।
• “কর্মসহায়ক গবেষণার উদ্দেশ্য পরস্পর বর্জনশীল যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে সমস্যাময় পরিস্থিতির সাথে নৈতিক কাঠামোয় সম্পৃক্ত লোকদের সাহায্য করা এবং সামাজিক বিজ্ঞানের উদ্দেশ্য সাধনে সহায়তা করা।”-র্যা পপোর্ট।
• “Action research is a form of collective self-reflective enquiry undertaken by participants in social situation in order to improve the rationality and justice of their own social or educational practices, as well as their understanding of those practices and the situations in which the practices are carried…….. The approach is only action research when it is collaborative, thought it is important to realize that action research of the group is achieved through the critically examined action of individuals group members.”- Kemmis and Mc Taggart.
• “Action Research is a three steps spiral process of (1) planning which involves reconnaissance; (2) talking actions and; (3) fact-finding about the results of the action.”-Kurt Lewin.
• “Action Research is the process by which practitioner’s attempts to study their problems scientifically in order to guide, correct and evaluate their decisions and actions.”-Stephen Corey.
• “Action Research in education is study connected by colleagues in a school setting of the result of their activities to improve instructions.”- Carl Ghekman.
• “Action Research is a fancy way of saying let’s study what’s happening at our school and decide how to make it a better place.” –Emily Calhoun.
কর্মসহায়ক গবেষণার উদ্ভাবক ও অন্যান্য যারা বিভিন্ন গবেষণার সাথে জড়িত তারা নিজেদের কর্মের সুবিধার্থেই এ ধরনের গবেষণা কর্মে যুক্ত হন যেন তাদের গবেষণা কর্ম অধিক গুরুত্ব লাভ করে।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল যারা শিক্ষার সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত নয়, তাদের পরিচালিত গবেষণার ফলাফল শিক্ষাক্ষেত্রে খুব একটা কার্যকরি নয়। শিক্ষাক্ষেত্রে গবেষণা ও শিক্ষাক্রমে শিক্ষকদের উৎসাহিত হবার প্র্রয়োজন তাদের শিক্ষাণ দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য। শিক্ষামূলক কর্মসহায়ক গবেষণা হল এক ধরনের শিক্ষা প্রযুক্তি যা দ্বারা একজন শিক্ষক কার্যকরিভাবে শিক্ষার্থীদের শিখনকে উন্নত করতে পারেন একই সাথে কর্মসহায়ক গবেষণা হতে প্রাপ্ত উপাত্ত কাজে লাগিয়ে একজন শিক্সক বুঝতে পারেন কি কারণে শিক্ষাক্ষেত্রে সমস্যা বিরাজমা এবং এর পরিবর্তনের কার্যকারিতা। শিক্ষার্থীদের জন্য সবচেয়ে প্রয়োজনীয় শিখন অভিজ্ঞতার উন্নয়নে কর্মসহায়ক গবেষণা হল শিক্ষকদের দ্বারা পরিচালিত একটি ধারাবাহিক অনুসন্ধান প্রক্রিয়া।
পরিশেষে আমরা বলতে পারি, যে প্রক্রিয়ায় গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তত্বকে তাৎক্ষনিক প্রয়োগের মাধ্যমে কোন সমস্যা সমাধান বা সমাজের চলতি রীতির পরিবর্তন করা হয় তাকে কর্মসহায়ক গবেষণা বলে।

কর্মসহায়ক গবেষণার প্রকৃতি ও বৈশিষ্ট্য
কর্মসহায়ক গবেষণা বাস্তব সমস্যাভিত্তিক গবেষণা পদ্ধতি যা বাস্তব সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানের সাধারণ তত্ত্ব আবিষ্কার করে এবং সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের সাথে যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করে থাকে। এটি সামাজিক গবেষণা থেকে একটি ভিন্ন গবেষণা পদ্ধতি।
কার্ট লিওন(১৯৪৭)- এর মতানুসারে কর্মসহায়ক গবেষণার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, একটি নির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণাধীনের অধীনে কোন পরিবর্তনশীল প্রকৃতি বিবেচনা করে কিছু কার্যক্রম এবং গবেষণা পরিচালনা করা।
নিম্নে কর্মসহায়ক গবেষণার বৈশিষ্ট্যসমূহ সংক্ষেপে উল্লেখ করা হল-
• কার্যভিত্তিক (Action Oriented): কর্মসহায়ক গবেষণা শুধু সাধারণ তত্ত্ব আবিষ্কার করে না, বরং সমস্যা সমাধানের জন্য তা কার্যে পরিণত করে।
• আবর্তনশীল (Cyclical Process): কর্মসহায়ক গবেষণা গবেষণার একটি চলমান প্রক্রিয়া যা সমস্যা চিহ্নিত করে, সমাধানের তত্ত্ব আবিষ্কার করে এবং তা বাস্তবে প্রয়োগ করে চক্রাকারে আবর্তিত হতে থাকে।
• সামগ্রিক প্রক্রিয়া (Integration Process): কর্মসহায়ক গবেষণা কোন স্তর বা ধাপ বুঝায় না, বরং গবেষণার সামগিক প্রক্রিয়াকে বুঝায়।
• বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া (Scientific Process): কর্মসহায়ক গবেষণা বৈজ্ঞানিকভাবে প্রাপ্ত তথ্যকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে বিশ্লেষণের মাধ্যমে নতুন তত্ত্ব আবিষ্কার করে বাস্তবিকভাবে প্রয়োগ করা হয়ে থাকে।
• ধারাবাহিক প্রক্রিয়া (Systematic Process): কর্মসহায়ক গবেষণা সমস্যা সমাধানের একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। এটি সমস্যা চিহ্নিতকরণ হতে শুরু হয়ে তত্ত্ব প্রণয়ন এবং তত্ত্ব বাস্তবে প্রয়োগ করে ফলাফল মূল্যায়ন পর্যন্ত বিস্তৃত।
• ভবিষ্যৎ সম্পর্কিত (Future Oriented): কর্মসহায়ক গবেষণা শুধু অতীত সমস্যা নিয়ে আলোচনা করে না বরং গবেষণা থেকে প্রাপ্ত তত্ত্ব ভবিষ্যতে প্রয়োগ করে সমস্যার সমাধান করে থাকে।
• বাস্তব সমস্যাভিত্তিক (Practical Problem Oriented): কর্মসহায়ক গবেষণা সব সময় সমাজ জীবনের বা প্রাতিষ্ঠানিক জীবনের বাস্তব সমস্যা নিয়ে গবেষণা কার্য পরিচালনা করে।
• যৌথ প্র্রচেষ্টা (Collaboration): কর্মসহায়ক গবেষণা গবেষক এবং সমস্যার সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিবর্গ যৌথ প্রচেষ্টার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করে থাকে।
• অবস্থানভিত্তিক (Situation): কর্মসহায়ক গবেষণা সমস্যার বিভিন্ন অবস্থানে ভিন্নতর হতে পারে। সব সমস্যার জন্য একই রকম প্রক্রিয়া ব্যবহার নাও হতে পারে।

তাছাড়া কর্মসহায়ক গবেষণার আরো কিছু বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায়। যেমন¬-
১. কর্মসহায়ক গবেষণা এক ধরনের আত্ম-প্রতিফলনমূলক অনুসন্ধান।
২. এটি ব্যবহারকারী বা অংশগ্রহণকারী সুবিধাভোগীদের দ্বারা গৃহীত হয়।
৩. এ গবেষণা সাধারণত স্বীয় পেশাগত, শিক্ষাগত, সামাজিক কার্য বা চর্চার উন্নয়ন অথবা স্বীয় দুর্বলতা আবিষ্কার ও উন্নয়নে পরিচালিত হয়।
৪. এটি এক ধরনের সহযোগিতাপূর্ণ গবেষণা তাই নতুন গবেষকবৃন্দ স্বীয় সমস্যা সমাধানে বিশেষজ্ঞ গবেষকদের কাছ কাছ থেকে সহযোগিতা লাভ করতে পারেন।
৫. কর্মসহায়ক গবেষণার জন্য কোন স্বত:সিদ্ধ একক সাধারণ পদ্ধতি নেই। তাই এখানে বিভিন্ন প্রকার পদ্ধতি প্রয়োগ করা যায় এবং তথ্য সংগ্রহের অংশ উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা যায়। পদ্ধতিগতভাবে কর্মসহায়ক গবেষণায় একই সাথে একাধিক পদ্ধতির সমন্বয় ও অনুসরণ করা সম্ভব। গবেষক এ বিষয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করেন।
৬. এটি যুক্তি নির্ভর এবং গণতান্ত্রিক পন্থা অবলম্বনে পরিচালিত হয়।
৭. এটি গবেষকদের প্রতিদিন যে সমস্ত পেশাগত কার্যক্রম সমাধা করেন, তার নিয়মতান্ত্রিক কার্যকারিতা যাচাই বা পরীক্ষা নিরীক্ষাকরণে সহায়তা করে।
৮. শিক্ষায় কর্মসহায়ক গবেষণার মূল আলোকপাত করা হয় শ্রেণীকক্ষ ও বিদ্যালয়ের উপর। এর মূল লক্ষ হচ্ছে সম্পৃক্তকরণ এবং শিক্ষাগত ভিত্তি হচ্ছে গুণগত মানোন্নয়ন।
৯. কর্মসহায়ক গবেষণা দ্বারা অর্জিত জ্ঞান, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও প্রশাসকের নির্দিষ্ট গণ্ডি থেকে মুক্ত হতে সাহায্য করে এবং শিখন ও নীতি নির্ধারণকে দৃঢ় করে।
১০. কর্মসহায়ক গবেষণা মূলত ৩টি ‘WH’ প্রশ্নের উত্তর খুজতে পরিচালিত হয়। যথা- কি (What), কেন (Why), কিভাবে (How)।

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে আমরা বলতে পারি, কর্মসহায়ক গবেষণা সর্বদাই ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সচেষ্ট। তাই মূলত আমাদের বুঝতে হবে, কিভাবে এ পরিবর্তন আনা যায়, কেন এই পরিবর্তন প্রয়োজন?কি পরিবর্তন আমরা চাই? তাহলে কর্মসহায়ক গবেষণার মূল লক্ষ্যে পৌছানো সম্ভব হবে।

তথ্যসূত্রঃ
১. মোঃ গোলাম ফারুক – কর্মসহায়ক গবেষণা
২. আলিম আল আইয়ুব আহমেদ – শিক্ষায় গবেষণা পদ্ধতি
৩. আহসান হাবিব – কর্মসহায়ক গবেষণা
৪. মলয় কুমার সাহা – কর্মসহায়ক গবেষণা
৫. জিনাত জামান – শিক্ষা গবেষণা ও কৌশল