সৈয়দ মাহবুব হাসান আমিরী

আইসিটি বিভাগ, ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ

গবেষণা

গবেষক ও তাঁর কাজের ধারা

গবেষণার সাথে সবসময় পরীক্ষা-নিরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ এবং পদ্ধতিগত কাজের ধারা বিদ্যমান থাকে। এটি সত্যের অনুসন্ধানে নিবেদিত।যে কোন সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে সত্যের প্রতিষ্ঠায় গবেষক কাজ করে থাকেন।সার্বজনীন কল্যাণ সাধনই গবেষকের গবেষণা কর্মের মুখ্য উদ্দেশ্য। তাই গবেষক সার্বজনীন শ্রদ্ধার পাত্র।

গবেষক
গবেষকের ইংরেজি প্রতিশব্দ হল Researcher বা Investigator- যার বাংলা প্রতিশব্দ হল যিনি গবেষণা করেন বা নতুনত্বের উদ্ভাবন করেন। অর্থাৎ যার একক প্রচেষ্টায় গবেষণা কার্য সম্পাদিত হয় কিংবা যার নির্দেষনায় সম্মিলিত প্রচেষ্টায় গবেষণা কার্য চলে তাকেই গবেষক বলা হয়। গবেষক একজন বিজ্ঞানী। কারণ গবেষণা কার্যের পরিসমাপ্তিতে নতুন কিছু সৃজনের মাধ্যমেই গবেষক বিজ্ঞানী হিসেবে স্বীকৃতি পেয়ে থাকেন।কাজেই গবেষক একজন মানুষ যিনি নির্ভেজাল সত্যের অনুসন্ধানী তিনি কখনও ব্যক্তিস্বার্থে মিথ্যার সাথে আপোস করেন না। গবেষকের মনের অনন্ত জিজ্ঞাসা; অদম্য কৌতূহলই হল গবেষকের চিরন্তন বৈশিষ্ট্য।গবেষক কখনও নিজেকে অলৌকিক ক্ষমতাধর হিসেবে দাবি করেন না।তিনি সবসময় পরীক্ষালব্ধ ফলাফলের ভিত্তিতে নতুন সিদ্ধান্ত প্রণয়ন করে থাকেন।গবেষকের তত্ত্ব ভুল প্রমানিত হলে তিনি তা সহজভাবে মেনে নেন।

আদর্শ গবেষকের বৈশিষ্ট্য
গবেষক রক্তে মাংসে গড়া একজন মানুষ হলেও তিনি অন্য সব দশটা মানুষের মত নন। তার মাঝে আলাদা কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য রয়েছে যা মানবীয় গুণাবলীর অন্তর্ভুক্ত।নিম্নে একজন আদর্শ গবেষকের প্রকৃতিগত বৈশিষ্ট্যাবলি সংক্ষিপ্ত পরিসরে উল্লেখ করা হল-
১. একজন আদর্শ গবেষক একজন বিজ্ঞানী; কৌতুহুলী মন যার চিরন্তন।
২. গবেষক নির্ভেজাল সত্যের অনুসন্ধানী এবং বাস্তব সমস্যা সমাধানে নতুনত্বের উদ্ভাবনে কষ্টসহিঞষ্ণু কর্মী।
৩. গবেষক আপন মনের অনন্ত জিজ্ঞাসার উত্তর সন্ধানী।
৪. গবেষক কঠোর পরিশ্রমী, ধৈর্যশীল, অধ্যবসায়ী, সত্যনিষ্ঠ এবং বিনয়ী।
৫. গবেষক সমস্যা সমাধানে সাহসী, দৃঢ় চেতা এবং সৃজনশীল কল্পনা শক্তির অধিকারী।
৬. গবেষক যুক্তিবাদী এবং কুসংস্কারমুক্ত দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী।
৭. মুক্ত মনে গবেষক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অনুসরণে কাজ করে থাকেন। অন্ধ বিশ্বাস তাকে স্পর্শ করতে পারে না।
৮. গবেষক সব সময় ধর্মীয় কিংবা সাম্প্রদায়িক সীমারেখার উর্ধ্বে সার্বজনীন কল্যাণে কাজ করে থাকেন।
৯. ভাল গবেষক তার নিজ ক্ষেত্রে পারদর্শী হবে। গবেষণা কর্মে যথেষ্ট জ্ঞান ও দক্ষতা থাকতে হবে।
১০. ভাল গবেষককে একজন ন্যায় নির্ধারক হতে হবে। তাকে আবেগপ্রবণ বা পক্ষপাতদুষ্ট হওয়া চলবে না। তাকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষের দিকে ধাবিত হতে হবে।
১১. একজন গবেষককে সকল দলিলপত্র নিরাপদে সংরক্ষণ করতে হবে। তাকে বিভিন্ন বিষয়ের ব্যাখ্যা দিতে হবে, পদ্ধতি বর্ণনা করতে হবে এবং কোন সংকোচ ছাড়াই গবেষণার সীমাবদ্ধতা ও ভুলের বিষয় উল্লেখ করতে হবে।
১২. একটি ভাল গবেষণার পরিমাণগত মূল্যমান থাকতে হবে। পরিমাণগত তথ্য গণগত তথ্য অপেক্ষা অনেক বেশি যথার্থ ও নির্ভরযোগ্য হয়। তাই একজন গবেষককে পরিমানগত গবেষণার উপর বেশি জোর দিতে হয়।

গবেষকের কাজের ধারা
গবেষকের অনুসন্ধান কার্যকেই মূলত গবেষণা বলে। আর এ গবেষণা করতে গিয়ে গবেষক যে পদ্ধতি অনুসরণ করে থাকেন তাকেই গবেষণার বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি বলে।বিভিন্ন বিজ্ঞানী কিংবা গবেষকের গবেষণাকার্য ভিন্ন হলেও তাদের কাজের ধারা অনেকটা একই রকম হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে সার্বজনীন গবেষণা কর্মের সত্য হিসেবে পরীক্ষ-নিরীক্ষা, পর্যবেক্ষণ, বিশ্লেষণ, সংশোধন এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতির অনুসরণকেই বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। গবেষকদের কাজের ধারা বর্ণনার ক্ষেত্রে গ্রীক দার্শনিক এ্যারিষ্টটল, ফ্রান্সিস, ইতালির জ্যোতির্বিদ গ্যালিলিও, এযাবতকালের শ্রেষ্ঠ্য বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটন প্রমুখের দৃষ্টিভঙ্গিকে মূল্যায়ন করা হয়ে থাকে।
বিজ্ঞানীগণ কিভাবে কাজ করেন এ সম্পর্কে তাদের অভিমত হল-
• “বিজ্ঞানীগণ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে কাজ করে থাকেন, তারা সত্যের অনুসন্ধানী এবং নিজস্ব বিচার বুদ্ধিতে চিরন্তন সত্যের তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।“
• কোন কিছু কেন ঘটে? কিভাবে ঘটে? গবেষক সেসব প্রশ্নের উত্তর খুজেঁন এবং তিনি পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া কোন কিছু গ্রহণ করেন না।
• গবেষক তার পর্যবেক্ষণকে যাচাই বাছাই করে তথ্য সংগ্রহ করে পরীক্ষণের জন্য চিন্তা করেন এবং পরীক্ষণ শেষে তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করেন।
• গবেষক তার তত্ত্বকে যাচাই, বাছাইয়ের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠা করার জন্য পরীক্ষা নিরীক্ষার আশ্রয় নেন এবং পরীক্ষালব্ধ ফলাফল হতে তার তত্ত্বকে প্রয়োজনে পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা সংশোধন করে থাকেন। এ ক্ষেত্রে তিনি অতীত ও বর্তমান ঘটনার পর্যবেক্ষণের উপর ব্যাপক জোর দেন
উপসংহার: পরিশেষে বলতে হয় গবেষক যখন প্রাকৃতিক অবস্থার পর্যবেক্ষণ করে প্রাপ্ত তথ্যের সত্যতা নির্ণয় করতে ব্যর্থ হন তখন তার গবেষণাগারে বিশেষভাবে নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণলব্ধ তথ্যের সত্যাসত্যতা নির্ণয় করে সিদ্ধান্ত দিয়ে থাকেন। তার এ সিদ্ধান্ত যখন সার্বজনীন মঙ্গলের উদ্দেশ্যে উৎসর্গ হয় তখনই একে নতুন আবিষ্কারের মর্যাদা দেয়া হয়ে থাকে।

তথ্যসূত্রঃ
১. ডঃ শাহজাহান তপন – থিসিস ও আ্যাসাইনমেন্ট লিখন
২. আলিম আল আইয়ুব আহমেদ – শিক্ষায় গবেষণা পদ্ধতি
৩. আহসান হাবিব – কর্মসহায়ক গবেষণা
৪. মোঃ গোলাম ফারুক – কর্মসহায়ক গবেষণা
৫. জিনাত জামান – শিক্ষা গবেষণা ও কৌশল
৬. মলয় কুমার সাহা – কর্মসহায়ক গবেষণা
৭. বিভিন্ন জার্নাল ও ব্লগ