সৈয়দ মাহবুব হাসান আমিরী

আইসিটি বিভাগ, ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ

বাংলা সাহিত্য

মেঘনাদবধ কাব্য’র প্রধান চরিত্রসমূহ

একটি মহৎ চরিত্র হৃদয়ে আপনা হইতে আবির্‌ভূত হইলে কবি যেরূপ আবেগের সহিত তাহা বর্ণনা করেন, মেঘনাদবধ কাব্যে তাহাই নাই। এখনকার যুগের মনুষ্য-চরিত্রের উচ্চ আদর্শ তাঁহার কল্পনায় উদিত হইলে, তিনি তাহা আর-এক ছাঁদে লিখিতেন। তিনি হোমরের পশুবলগত আদর্শকেই চোখের সমুখে খাড়া রাখিয়াছেন। হোমর তাঁহার কাব্যারম্ভে যে সরস্বতীকে আহ্বান করিয়াছেন সেই আহ্বানসঙ্গীত তাঁহার নিজ হৃদয়েরই সম্পত্তি, হোমর তাঁহার বিষয়ের গুরুত্ব ও মহত্ত্ব অনুভব করিয়া যে সরস্বতীর সাহায্য প্রার্থনা করিয়াছিলেন তাহা তাঁহার নিজের হৃদয় হইতে উত্থিত হইয়াছিল। মাইকেল ভাবিলেন, মহাকাব্য লিখিতে হইলে গোড়ায় সরস্বতীর বর্ণনা করা আবশ্যক, কারণ হোমর তাহাই করিয়াছেন; অমনি সরস্বতীর বন্দনা সুরু করিলেন। মাইকেল জানেন অনেক মহাকাব্যে স্বর্গ-নরক-বর্ণনা আছে; অমনি জোর-জবর্দস্তি করিয়া কোন প্রকারে কায়ক্লেশে অতি সঙ্কীর্ণ, অতি বস্তুগত, অতি পার্থিব, অতি বীভৎস, এক স্বর্গ-নরক-বর্ণনার অবতারণ করিলেন। মাইকেল জানেন কোন কোন বিখ্যাত মহাকাব্যে পদে পদে স্তূপাকার উপমার ছড়াছড়ি দেখা যায়; অমনি তিনি তাঁহার কাতর পীড়িত কল্পনার কাছ হইতে টানা-হেঁচড়া করিয়া গোটাকতক দীনদরিদ্র উপমা ছিঁড়িয়া আনিয়া একত্র জোড়াতাড়া লাগাইয়াছেন। তাহা ছাড়া, ভাষাকে কৃত্রিম ও দুরূহ করিবার জন্য যত প্রকার পরিশ্রম করা মনুষ্যের সাধ্যায়ত্ত তাহা তিনি করিয়াছেন। একবার বাল্মীকির ভাষা পড়িয়া দেখ দেখি, বুঝিতে পারিবে মহাকবির ভাষা কিরূপ হওয়া উচিত, হৃদয়ের সহজ ভাষা কাহাকে বলে? যিনি পাঁচ জায়গা হইতে সংগ্রহ করিয়া, অভিধান খুলিয়া, মহাকাব্যের একটা কাঠাম প্রস্তুত করিয়া মহাকাব্য লিখিতে বসেন– যিনি সহজভাবে উদ্দীপ্ত না হইয়া, সহজ ভাষায় ভাব প্রকাশ না করিয়া, পরের পদচিহ্ন ধরিয়া কাব্যরচনায় অগ্রসর হন– তাঁহার রচিত কাব্য লোকে কৌতূহলবশতঃ পড়িতে পারে, বাঙ্গালা ভাষায় অনন্যপূর্ব্ব বলিয়া পড়িতে পারে, বিদেশী ভাবের প্রথম আমদানী বলিয়া পড়িতে পারে, কিন্তু মহাকাব্য ভ্রমে পড়িবে কয় দিন? কাব্যে কৃত্রিমতা অসহ্য এবং সে কৃত্রিমতা কখনও হৃদয়ে চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত করিতে পারে না।

 

রাবণ

ভারতীয় সাহিত্যে অনিষ্টের প্রতীকরূপে রাবণ চরিত্র সুপরিচিত। দুর্ধর্ষ রাক্ষসরাজা রাবণ সীতার মতো সতী হরণ পাপে ধীকৃত, সে কারণে ভারতবাসীর মনে তার যে চিত্র আঁকা সেটি নারী হরণকারী, নীতিকামবর্জিত মানবিক গুণহীন পিশাচ রূপে। মহাকবি বাল্মীকি তার কাব্যে রাবণকে এভাবেই সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু মধুসূদন রাবণকে উপস্থাপন করেছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন চেতনায়। মধুসূদনের রাবন মূলত মধু মানসের প্রতিচ্ছবি। যে মধুসূদন ইউরোপীয় নব চেতনায় উদ্বুদ্ধ এবং উনিশ শতকের বাঙালি নবজাগরণ বা রেনেসাঁর প্রতিভূ- তিনি তার সৃষ্ট রাবণকে করে তুলেছেন মানবতাবোধ সম্পন্ন এক অসাধারণ চরিত্রে।

মেঘনাদবধ কাব্যে রাবণ রাক্ষস হয়েও ঘৃণার পাত্র নয়, মহাপরাক্রমশালী রাক্ষসরাজা। শৌর্যে-বীর্যে অতুলনীয় তার মহিমা। স্বর্ণ লঙ্কার অধিপতি সে, বিপুল ঐশ্বর্যের অধিকারী। শুধু তাই নয়, রাজার কর্তব্যে অটল, প্রজাহিতৈষী, ভাইয়ের জন্য তার অসীম মমত্ব। রাবণ সন্তানবৎসল পিতা, স্ত্রীর সুখ-দুঃখের সমব্যথী। অপরিমেয় দেশপ্রেম তাকে করেছে পরাক্রমশালী যোদ্ধা। মাইকেল রাবণ চরিত্র চিত্রণে মানবিক গুণাবলীর সমাবেশ ঘটিয়েছেন তাকে ক্ষুদ্র নর রাম থেকে শ্রেষ্ঠ করার অভিপ্রায়ে। মধুসূদন বিশ্বাস করতেন ঐশ্বর্য জাগতিক শৌর্যের মানদ-। কাব্যের প্রথমে তিনি রাবণের রাজসভার বর্ণনায় লিখেছেন, ‘ভূতলে অতুল’ সভা।

রাবণ হৃদয় ঐশ্বর্যেও কম ঐশ্বর্যশালী নয়- শৌর্যে-বীর্যে, শক্তি-সাহসে, বীরত্ব-পৌরুষে অতুলনীয়। তার দৃষ্টিতে রাম-লক্ষ্মণ পরদেশী, বনবাসী। পরদেশী লক্ষ্মণ তীর ছুড়ে রাবণের ভগ্নি সূর্পণখার নাক থেতলে দেয়। এই অপমান সহ্য করা রাবণের পক্ষে অসম্ভব। ভগ্নির অপমানের প্রতিশোধ নিতেই সে সীতা অপহরণ করে। শক্তিধর রাবণ স্পর্ধিত রাম-লক্ষ্মণকে যথোপযোক্ত শাস্তি দিতে বদ্ধ পরিকর।

গভীর অনুভূতিসম্পন্ন রাবণ শ্রেষ্ঠ পুত্র মেঘনাদের মৃত্যু সংবাদ শুনে সিংহাসনচ্যুত হয়ে ভূতল শায়ী হয়েছে। শোকের প্রাবল্য কেটে যেতেই নিজে যুদ্ধে যাবে বলে সৈন্যদের যুদ্ধ সাজে সাজতে আদেশ দিয়েছে। রাজমহিষী মান্দাদরীকে এই বলে সান্ত¡না দিচ্ছে যে, শত্রুসৈন্য নিঃশেষ করে আসার পর অনেক সময় পাওয়া যাবে- তখন অহরাত্র স্মরণ করা যাবে হারানো স্বজন-প্রিয়জনকে।

রাবণ নিয়তির পক্ষপাতিত্বের রহস্য ঠিক বুঝে উঠতে পারে না। রাম-লক্ষ্মণ অপরাধ করেও নিয়তির সমর্থন পুষ্ট, অথচ সে অপরাধ না করে কেন নিয়তি লাঞ্ছিত? লোকবল, অস্ত্রবল, মনোবল থাকা সত্ত্বেও যুদ্ধে তার ক্রমাগত পরাজয় হচ্ছে। হারের কারণেই নিয়তি সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠছে রাবণ। তার উপলব্ধি ‘বিধি প্রসারিছে বাহু বিনাশিতে লঙ্কা মম’, কিন্তু কেন নিয়তির এই নিষ্ঠুর আচরণ?

প্রচলিত ধারণায় যেটাকে পাপ বলা হয়, রাবণ সে ধারণা মানতে রাজি নয়। সীতাকে হরণ করে সে পাপ করেনি, ভগ্নি অপমানের প্রতিশোধ নিতে চেয়েছে। তবে কেন বিধির বিধান তার প্রতি বিরূপ? কেন তাকে এই শাস্তি পেতে হলো? বিশ্ব বিধান কি তবে পক্ষপাত দুষ্ট? বিশৃঙ্খল? ন্যায়-অন্যায় বোধ কি সেখানে বিলুপ্ত অথবা অপমৃত?

এসব প্রশ্ন আসলে উনিশ শতকের নবজাগরণে প্রভাবিত জনমানসের প্রশ্ন। কবি মধুসূদনের ব্যক্তি মানুষের প্রশ্ন বলেও ধরা যায়। মধুসূদনের জীবনে নিয়তির নিষ্ঠুররূপ অপ্রত্যক্ষ নয়। তিনি মনে করেন তিনি নিয়তি-লাঞ্ছিত। নিয়তির অমোঘ বিধান তিনি খণ্ডাতে পারেননি, তার মানস চরিত্র রাবণও নিয়তির ঊর্ধ্বে উঠতে পারেনি।

পৃথিবীর সবচেয়ে কষ্টকর, বেদনার্ত কাজটি করতে হয়েছে রাবণকে। পিতা হয়ে পুত্রের শেষকৃত্য করাটা যে কতটা মর্মান্তিক তা ভুক্তভোগী ছাড়া কে জানে? যুদ্ধ ক্লান্ত পর্যুদস্ত রাবণের হৃদয়দীর্ণ দীর্ঘশ্বাস পাঠককেও ব্যাকুল করে :

 

‘ছিল আশা, মেঘনাদ, মুদিব অন্তিমে
এ নয়ন দ্বয় আমি তোমার সম্মুখে;-
সঁপি রাজ্যভার, পুত্র, তোমায়, করিব
মহাযাত্রা! কিন্তু বিধি- বুঝিব কেমনে
তার লীলা? ভাড়াইলা সে মুখ আমারে!’

 

রাবণ জানে সীতার জন্যই তার এই দুর্গতি। সীতাকে ফিরিয়ে দিলেই সে পূর্বাবস্থা ফিরে পেতে পারে। কিন্তু এ কথা চিন্তা করাও তার পক্ষে অসম্ভব। রাবণ ধ্বংস হয়ে যাবে, তবুও পরাভব মানবে না। এ কারণেই সমস্ত বিশ্ব বিধানের বিরুদ্ধে শেষ পর্যন্ত একাকী লড়েছে রাবণ, তবু নতি স্বীকার করেনি।

রাবণ চরিত্রের চারিত্রিক মাধুর্য, দুর্ধর্ষ শক্তি মত্তা, অপরিমেয় হৃদয়াবেগ তাকে মহাকাব্যের নায়ক করেছে। এ কথা সর্বজন বিধিত যে, ‘মেঘনাদবধ কাব্য’ মাইকেল মধুসূদন দত্তের অমর সৃষ্টি। এই অমর সৃষ্টির অসাধারণ চরিত্র রাবণ। মহাকাব্যের নায়ক উপযোগী করে শুধু নয়, বিশ্ব সাহিত্যের অনন্য চরিত্র হিসেবে রাবণকে সৃষ্টি করেছেন মহাকবি মধুসূদন।

 

মেঘনাদ:

মাইকেল মধুসূদন দত্ত বিরচিত মেঘনাদবধ কাব্য-এ ইন্দ্রজিৎ বা মেঘনাদ নায়ক এবং এক পৌরাণিক যোদ্ধা। তিনি লঙ্কাধিপতি রাবণের পুত্র। ভ্রাতা বীরবাহুর মৃত্যুর পর লঙ্কার রাজলক্ষ্মীর প্ররোচনায় তিনি যুদ্ধযাত্রা করেন। এই উপাখ্যানে মেঘনাদের স্ত্রী প্রমীলা। দেবগণ মেঘনাদের যুদ্ধযাত্রার সময় রামচন্দ্রকে রক্ষা করার পরিকল্পনা করেন। মেঘনাদ রাম ও রাবণের মধ্যে সংঘটিত লঙ্কার যুদ্ধে এক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। তিনি যুদ্ধে গমন করার পূর্বে এক যজ্ঞানুষ্ঠান করতেন। এই যজ্ঞের বলে অজেয় হয়ে তিনি দুইবার রাম ও লক্ষ্মণকে পরাভূত করেন। কিন্তু তৃতীয় বারে বিভীষণের সহায়তায় লক্ষ্মণ যজ্ঞাগারে উপস্থিত হয়ে নিরস্ত্র অবস্থায় তাঁকে বধ করেন। নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে যজ্ঞ সম্পাদনা কালে লক্ষ্মণ নিরস্ত্র অবস্থায় মেঘনাদকে হত্যা করেন। তারপর প্রতিশোধকল্পে রাবণ লক্ষ্মণকে শক্তিশেলে বিদ্ধ করলে রাম পাতালপুরীতে প্রবেশ করে মৃত পিতা দশরথের কাছ থেকে লক্ষ্মণের পুনরুজ্জীবনের উপায় জেনে আসেন। গ্রন্থশেষে রয়েছে মেঘনাদের অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য রাবণের রামের নিকট সাতদিন যুদ্ধবিরতি প্রার্থনা ও মহাসমারোহে মেঘনাদের অন্ত্যেষ্টির বিবরণ। মেঘনাদের জননী ছিলেন মায়াসুরের কন্যা তথা রাবণের রাজমহিষী মন্দোদরী। জন্মের সময় মেঘনাদ বজ্রনাদের ন্যায় চিৎকার করেছিলেন। তাই তাঁর নামকরণ হয় মেঘনাদ। অন্যমতে, মেঘের আড়াল থেকে ঘোর যুদ্ধ করতেন বলে তাঁর নাম হয় মেঘনাদ। আবার দেবরাজ ইন্দ্রকে পরাভূত করেছিলেন বলে তিনি ইন্দ্রজিৎ নামেও অভিহিত হন।

মেঘনাদের জন্মসংক্রান্ত আর একটি কাহিনি প্রচলিত আছে যে, সমুদ্রমন্থন কালে সুলক্ষণা নামে এক সুন্দরী নারী উঠেছিলেন। তিনি পার্বতীর সখি হন। একদিন স্নানান্তে পার্বতী সুলক্ষণাকে তাঁর পরিধেয় বস্ত্র আনতে বলেন। বস্ত্র আনতে গেলে শিব সুলক্ষণাকে একা পেয়ে সম্ভোগ করেন। সুলক্ষণা বিব্রত হয়ে পড়লে শিব বর দেন যে তাঁর বিবাহের পরই পুত্রের জন্ম হবে। এদিকে পার্বতীর কাছে পরে বস্ত্র নিয়ে গেলে তিনি সব বুঝতে পারেন। তিনি সুলক্ষণাকে অভিশাপ দেন। সুলক্ষণা মন্দোদরীতে পরিণত হন। এই কারণে মেঘনাদের অপর নাম হয় কানীন। মেঘনাদের দুই সহোদরের নাম অতিকায় ও অক্ষয়কুমার। বাল্যকালেই মেঘনাদ ব্রহ্মাস্ত্র, পাশুপতাস্ত্র, বৈষ্ণবাস্ত্র প্রভৃতি দৈব অস্ত্রশস্ত্রের অধিকারী হয়েছিলেন। তাঁর গুরু ছিলেন দৈত্যগুরু শুক্রাচার্য। মেঘনাদ নাগরাজ শেষনাগের কন্যা সুলোচনাকে বিবাহ করেছিলেন।

 

সীতা:

মহাকাব্য মেঘনাদবধে প্রধান নারী চরিত্র তথা বিষ্ণুর সপ্তম অবতার রামের পত্নী। হিন্দু বিশ্বাস অনুযায়ী, তিনি শক্তিরূপা লক্ষ্মীর অবতার। লক্ষ্মী মানবসমাজের সম্মুখে কঠিন জীবনযাপনের এক দৃষ্টান্ত রাখার উদ্দেশ্যে সীতারূপে অবতার গ্রহণ করেন। এই জন্য হিন্দুসমাজে সীতাকে আদর্শ স্ত্রী তথা এক আদর্শ নারীর এক উদাহরণ বলে মনে করা হয়।রামায়ণে সীতা বহু নামে উল্লেখিতা হয়েছেন। তবে তিনি মুলতঃ সীতা নামেই পরিচিতা। জনকের কন্যা বলে সীতাকে জানকী বলা হয়। মিথিলা রাজ্যের কন্যা হওয়ায় তিনি মৈথিলি নামেও পরিচিতা। এছাড়া তিনি রাম-এর স্ত্রী হওয়ায় তাঁকে রমা ও বলা হয়ে থাকে। রামায়ণ অনুসারে, সীতা ভূদেবী পৃথিবীর কন্যা ও রাজর্ষি জনকের পালিতা কন্যা। রামচন্দ্র চৌদ্দো বছরের জন্য বনবাসে গেলে সীতা তাঁর সঙ্গী হন। পরে রাবণ সীতাকে হরণ করে লঙ্কায় নিয়ে গেলে রাম ও রাবণের মধ্যে সংঘাতের সূত্রপাত হয়। তাকে উদ্ধার করতে রাম, লক্ষণ , হনুমান সহ বিশাল বাহিনী লংকা আক্রমণ ও ধ্বংস করে এবং কিষ্কিন্ধ্যার বানরদের সহায়তায় রাম রাবণকে পরাজিত ও নিহত করে সীতাকে উদ্ধার করেন। সীতাকে উদ্ধার করে নিয়ে এলেও পরবর্তীতে রামচন্দ্রের অযোধ্যা রাজ্যের প্রজারা সীতার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলে। সীতার চরিত্রের পবিত্রতা প্রমাণের জন্য রাম অগ্নিপরীক্ষার আয়োজন করেন। অগ্নিপরীক্ষার অংশ হিসাবে সীতাকে অগ্নিকুণ্ডে প্রবেশ করতে হয়। সীতা সতীসাধ্বী হলে আগুন তার কোনো ক্ষতি করবে না, এই ছিলো সবার বিশ্বাস। অগ্নি রীক্ষার মাধ্যমে সীতার চরিত্রের পবিত্রতা প্রমাণ হলে রামচন্দ্র সীতাকে ঘরে ফিরিয়ে নেন। কিন্তু পরবর্তীতে আবারও সীতার চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। তখন রাম সীতাকে আবারও বনবাসে পাঠান। সেখানে বাল্মিকী মুণির আশ্রমে সীতা আশ্রয় পান। এর কিছুদিন পরেই সী্তার দুই পুত্র সন্তান – লব ও কুশের জন্ম হয়। এই দুই পুত্র সন্তান বড় হওবার পরে রাম একবার শিকার করতে বনে গেলে রামের সাথে পুত্রদের পুনর্মিলন হয়। কিন্তু সীতার চরিত্র নিয়ে আবারও প্রজাদের নিন্দা শুরু হলে লজ্জ্বা ও ক্ষোভে সীতা পাতালে প্রবেশ করেন।

 

রাম:

বিষ্ণুর সপ্তম অবতার রাম ছিলেন রাজা দশরথ ও তাঁর জ্যৈষ্ঠা মহিষী কৌশল্যার জ্যৈষ্ঠ প্রিয়তমপুত্র। মেঘনাদবধে রামকে মর্যাদা পুরুষোত্তম অর্থাৎসর্বগুণের আধার বলে অভিহিত করা হয়েছে। দ্বিতীয়া স্ত্রী কৈকেয়ীর চক্রান্তেদশরথ রামকে ১৪ বছরের জন্য বনবাসেযাওয়ার নির্দেশ দিতে বাধ্য হন। রামও পিতার আজ্ঞাশিরোধার্য করে বনবাসে গমন করেন। সীতা – রামের প্রিয়তমা পত্নী এবং রাজা জনকের পালিতা কন্যা। সীতার অপর নাম জানকী। তিনি বিষ্ণুপত্নী দেবী লক্ষ্মীরঅবতার। রামায়ণে তাঁকে নারীজাতির আদর্শস্থানীয়া বলে বর্ণনা করা হয়েছে। তিনি স্বামীর সঙ্গে বনবাসে গমন করেন। রাবণ তাঁকে অপহরণকরে লঙ্কায় বন্দী করে রাখেন। রাম রাবণকে পরাজিত করে তাঁকে উদ্ধার করেন। পরবর্তীকালে তিনি রামের দুই যমজ পুত্র লব ও কুশের জন্ম দেন। হনুমান – কিষ্কিন্ধ্যা রাজ্যের এক বানর । তিনি শিবের (একাদশ রুদ্র) অবতার এবং রামের আদর্শ ভক্ত। তাঁরপিতা বানররাজ কেশরী ও মাতা অঞ্জনা। সীতার অবস্থান নির্ণয় ও উদ্ধার তথা লঙ্কার যুদ্ধে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেন। লক্ষ্মণ – রামের ভ্রাতা। তিনি স্বেচ্ছায় রাম ও সীতার সঙ্গে বনবাসে গমন করেন ও সেখানে তাঁদের রক্ষা করে চলেন। লক্ষ্মণ ছিলেন বিষ্ণুর সহচর শেষনাগের অবতার। মারীচের ছলনায় রামের বিপদাশঙ্কায় তিনি সীতাকে একাকী ফেলে যেতে বাধ্য হন। সেই সুযোগে রাবণ সীতাকে অপহরণ করেন। রাবন – লঙ্কার রাক্ষসরাজা।দশ হাজার বছর কঠোর তপস্যা করে তিনি সৃষ্টিকর্তা ব্রহ্মার কাছ থেকে এই বর লাভ করেন যে কোনো দেব, দানব বা ভৌতিক জীব তাঁকে বধ করতে পারবেন না। তিনি ছিলেন এক শক্তিশালী রাক্ষসরাজা। ঋষিদের উপর অত্যাচার চালিয়ে করে তিনি বিশেষ আমোদ অনুভব করতেন। ব্রহ্মার বরদানকে এড়িয়ে তাঁকে হত্যা করার জন্য বিষ্ণুকে মানব রূপে জন্মগ্রহণ করতে হয়। দশরথ – অযোধ্যার রাজা ও রামের পিতা। তাঁর তিন পত্নীঃ কৌশল্যা, কৈকেয়ী ও সুমিত্রা এবং রাম ব্যতীত অপর তিন পুত্রঃ ভরত , লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্ন। দশরথের প্রিয়তমা পত্নী কৈকেয়ী তাঁকে বাধ্য করেন রামকে ১৪ বছরের জন্য বনবাসে পাঠিয়ে ভরতকে যুবরাজ ঘোষণা করতে। রাম বনে গেলে পুত্রশোকে দশরথের মৃত্যু হয়। ভরত– দশরথের পুত্র। যখন তিনি জানতে পারেন যে রামকে বনে পাঠানোর প্রধান চক্রী তাঁর মা এবং তাঁরই জন্য পুত্রশোকে পিতার মৃত্যু হয়েছে, তখন তিনি ঘৃণাভরে রাজপদ প্রত্যাখ্যান করে রামের অনুসন্ধানে বাহির হন। কিন্তু রাম প্রত্যাবর্তনে অসম্মত হলে, তিনি রামের খড়ম দুখানি চেয়ে নেন। সেইখড়ম দুটি সিংহাসনে স্থাপন করে পরবর্তী ১৪ বছর রামের নামে অযোধ্যা শাসন করেছিলেন ভরত। শত্রুঘ্ন – দশরথ ও সুমিত্রার পুত্র। তিনি রামের কনিষ্ঠ ও লক্ষ্মণের যমজ ভ্রাতা এবং শ্রুতকীরতির পতি ।

 

লক্ষ্মণ:

লক্ষ্মণ রামের বৈমাত্রেয় ভ্রাতা ও তাঁর ঘনিষ্ঠ সহযোগী। কোনো কোনো হিন্দু সম্প্রদায়ে লক্ষ্মণকেও অবতার বা রামের অপর রূপ মনে করা হয়। আবার কোনো কোনো হিন্দু সম্প্রদায়ে তাঁকে শেষনাগের অবতার মনে করা হয়। অযোধ্যার রাজা দশরথের কনিষ্ঠা মহিষী সুমিত্রার দুই যমজ পুত্র হলেন লক্ষ্মণ ও শত্রুঘ্ন। তিনি রামের অত্যন্ত অনুগত ছিলেন। বিশ্বামিত্র রাক্ষসবধের জন্য রামকে আমন্ত্রণ জানালে লক্ষ্মণ তাঁর সঙ্গী হন। পরবর্তীকালে তিনি রামকে পিতার আদেশের বিরুদ্ধে বনগমনে না যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু রাম বনবাসে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকলে, লক্ষ্মণও তাঁর সঙ্গে বনে যান। বনবাসকালে তিনি একাধারে রামের ভাই, বন্ধু ও সহায়কের ভূমিকা পালন করেছিলেন। লঙ্কার যুদ্ধে তিনি রাবণের পুত্র মেঘনাদকে বধ করেন। বনবাসের শেষে রাম অযোধ্যার রাজা হলে লক্ষ্মণ তাঁর মন্ত্রী নিযুক্ত হন। উত্তরকাণ্ডে রাম সীতাকে নির্বাসিত করলে, লক্ষ্মণ তাঁকে বাল্মীকির তপোবনে রেখে আসেন। রামচন্দ্র যখন কালপুরুষের সঙ্গে কথা বলছিলেন, তখন লক্ষ্মণ দ্বাররক্ষীর ভূমিকা পালন করেন। এই সময় দুর্বাশা ঋষি রামের সাক্ষাৎপ্রার্থী হলে, তিনি কাউকে রামের কাছে যেতে না দেওয়ার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ করে দুর্বাসাকে রামের কাছে নিয়ে যান। লক্ষ্মণ সীতার কনিষ্ঠা ভগিনী উর্মিলাকে বিবাহ করেছিলেন। তাঁর দুই পুত্রের নাম ছিল অঙ্গদ ও ধর্মকেতু। কথিত আছে, লখনউ শহরটি (বর্তমান উত্তরপ্রদেশ রাজ্যের রাজধানী) লক্ষ্মণ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। প্রতিজ্ঞাভঙ্গের অপরাধে রাম তাঁকে পরিত্যাগ করলে, তিনি সরযূ নদীর তীরে যোগাবলম্বে দেহত্যাগ করেন।

 

মন্দোদরী:

মন্দোদরী আক্ষরিক অর্থে “কোমল উদর বিশিষ্টা”; তিনি ছিলেন লঙ্কার রাক্ষস রাজা রাবণের রাজমহিষী। মেঘনাদবধ মহাকাব্যে তাঁকে সুন্দরী, ধর্মপ্রাণা ও নীতিপরায়ণা বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি পৌরাণিক “পঞ্চকন্যা”-র (পঞ্চসতী, যাঁদের নাম উচ্চারণ করলে পাপ দূর হয় বলে হিন্দুদের বিশ্বাস) অন্যতম। মন্দোদরী ছিলেন অসুররাজ ময়াসুর ও অপ্সরা হেমার কন্যা। মন্দোদরীর তিন পুত্র ছিল: মেঘনাদ (ইন্দ্রজিৎ), অতিকায় ও অক্ষয়কুমার। রামায়ণের কোনো কোনো সংস্করণ অনুযায়ী, মন্দোদরী রামের পত্নী সীতারও গর্ভধারিণী মা। উল্লেখ্য, সীতাকেই তাঁর স্বামী রাবণ অন্যায়ভাবে চুরি করে এনেছিলেন। স্বামীর দোষ সত্ত্বেও মন্দোদরী তাঁকে ভালবাসতেন এবং তাঁকে সত্যপথে চলার উপদেশ দিতেন। মন্দোদরী বারবার সীতাকে রামের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য রাবণকে পরামর্শ দিয়েছিলেন। কিন্তু রাবণ তাঁর কথায় কর্ণপাত করেননি। রামায়ণে রাবণের প্রতি মন্দোদরীর ভালবাসা ও আনুগত্যের প্রশংসা করা হয়েছে।

রামায়ণের একাধিক সংস্করণে রামের বানরসেনার হাতে মন্দোদরীর হেনস্থার উল্লেখ পাওয়া যায়। কোনো কোনো সংস্করণে বলা হয়েছে, তাঁকে ব্যবহার করে বানরেরা রাবণের যজ্ঞ ভণ্ডুল করেছিল; আবার কোথাও বলা হয়েছে, তাঁর যে সতীত্ব রাবণের জীবনরক্ষা করছিল, তা তারা নষ্ট করে। হনুমান কৌশলে তাঁর কাছ থেকে রাবণের মৃত্যুবাণের অবস্থান জেনে নিয়েছিলেন।

জন্মবৃত্তান্ত বর্ণিত হয়েছে: ঋষি কশ্যপের পুত্র ময়াসুর হেমা নামে এক অপ্সরাকে বিবাহ করেন। তাঁদের দুই পুত্র হয় – মায়াবী ও দুন্দুভি। কিন্তু তাঁরা অনেক দিন ধরে একটি কন্যাসন্তান প্রাপ্তির ইচ্ছা পোষণ করছিলেন। তাই তাঁরা শিবের তপস্যা শুরু করেন। এমন সময় মধুরা নামে এক অপ্সরা কৈলাস পর্বতে শিবের পূজা করতে আসেন। পার্বতীর অনুপস্থিতির সুযোগে শিব রতিক্রিয়ার লিপ্ত হন। পরে পার্বতী ফিরে এসে মধুরার স্তনে শিবের গায়ের ছাই দেখতে পান। ক্রুদ্ধ হয়ে পার্বতী মধুরাকে অভিশাপ দেন বারো বছর ব্যাঙ হয়ে থাকতে। শিব মধুরাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলেন যে বারো বছর পরে সে আবার এক সুন্দরী নারীতে পরিণত হবে এবং এক মহাপরাক্রমী বীরের সঙ্গে তাঁর বিবাহ হবে। বারো বছর পর মধুরা পুনরায় এক সুন্দরী নারীতে পরিণত হন। তখন তিনি কুয়োর ভিতর থেকে চিৎকার করতে থাকেন। কাছেই ময়াসুর ও হেমা তপস্যা করছিলেন। তাঁরা তাঁর ডাকে সাড়া দেন এবং তাঁকে পালিতা কন্যারূপে গ্রহণ করেন। তাঁরা তাঁকে মন্দোদরী নামে প্রতিপালন করতে থাকেন। মায়াসুরের বাড়িতে এসে রাবণ মন্দোদরীর প্রেমে পড়ে। অনতিকাল পরেই রাবণ বৈদিক মতে মন্দোদরীকে বিবাহ করেন। রাবণের ঔরসে মন্দোদরীর তিনটি পুত্র জন্মায়, মেঘনাদ, অতিকায় ও অক্ষয়কুমার।

 

মহৎ চরিত্র যদি বা নূতন সৃষ্টি করিতে না পারিলেন, তবে কবি কোন্‌মহৎকল্পনার বশবর্ত্তী হইয়া অন্যের সৃষ্ট মহৎ চরিত্র বিনাশ করিতে প্রবৃত্ত হইলেন? কবি বলেন: ঐ ধনড়সভড়ন ছতল তশধ বভড় ক্ষতথথরন। সেটা বড় যশের কথা নহে — তাহা হইতে এই প্রমাণ হয় যে, তিনি মহাকাব্য-রচনার যোগ্য কবি নহেন। মহত্ত্ব দেখিয়া তাঁহার কল্পনা উত্তেজিত হয় না। নহিলে তিনি কোন্‌প্রাণে রামকে স্ত্রীলোকের অপেক্ষা ভীরু ও লক্ষ্ণণকে চোরের অপেক্ষা হীন করিতে পারিলেন! দেবতাদিগকে কাপুরুষের অধম ও রাক্ষসদিগকেই দেবতা হইতে উচ্চ করিলেন! এমনতর প্রকৃতিবহির্‌ভূত আচরণ অবলম্বন করিয়া কোন কাব্য কি অধিক দিন বাঁচিতে পারে? ধূমকেতু কি ধ্রুবজ্যোতি সূর্য্যের ন্যায় চিরদিন পৃথিবীতে কিরণ দান করিতে পারে? সে দুই দিনের জন্য তাহার বাষ্পময় লঘু পুচ্ছ লইয়া, পৃথিবীর পৃষ্ঠে উল্কা বর্ষণ করিয়া, বিশ্বজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া আবার কোন্‌অন্ধকারের রাজ্যে গিয়া প্রবেশ করে।

LEAVE A RESPONSE

Your email address will not be published. Required fields are marked *