সৈয়দ মাহবুব হাসান আমিরী

আইসিটি বিভাগ, ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ

শিক্ষা

শিক্ষাক্রম তত্ত্ব ও মডেলের রূপান্তর এবং এর সমালোচনামূলক বিবরণ

একজন প্রকৌশলীর জন্য যেমন নীল নকশা ছাড়া কোন স্থাপনা দাঁড় করানো সম্ভব নয় ঠিক তেমনি, শিক্ষাক্রম ছাড়া শিক্ষা ব্যবস্থাকে দাঁড় করানো যায় না। শিক্ষার সাথে জড়িত যাবতীয় কার্যাবলি শিক্ষাক্রমের অন্তর্গত। আসন্ন একবিংশ শতাব্দী তথ্য প্রযুক্তির ভরপুর শতাব্দী হবে বলে সমকালের বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদগণ ভবিষ্যৎবাণী করছেন। আর হালে কম্পিউটার, ইন্টারনেট, ই-মেইল, ওয়েবসাইট, টেলিকনফারেসিং ইত্যাদির ব্যবহার  যে গতিতে বাড়ছে তাতে বলা যায় যে তাঁরদের ভবিষ্যৎবাণী অচিরেই বাসত্মবে রূপলাভ করবে। দ্রুত পরিবর্তনশীল প্রযুক্তির সঙ্গে খাপ-খাইয়ে চলার জন্য ব্যক্তি, পরিবার সমাজ ও রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে এতদবিষয়ে আগ্রহ বাড়ছে।  ফলে শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা ও এর গুরুত্ব উপলব্ধির মাত্রা যতই  বৃদ্ধি পাচ্ছে শিক্ষাক্রম সম্পর্কে জনগণের জানার আগ্রহ ততই বাড়ছে। শিক্ষাক্রমের প্রয়োজনীয়তা এবং তার উন্নয়ন সমৃদ্ধে বিশ্ব্‌ব্যাপী প্রচারণা শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর। কারণ তখন পৃথিবীর বহু দেশ ঔপনিবেশিক শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভ করে। এসব নতুন স্বাধীনতা প্রাপ্ত রাষ্ট্র স্ব স্ব সমাজের চাহিদা মাফিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজানোর জন্য মনোনিবেশ করে। ফলে চল্লিশ দশকের শেষার্ধে থেকে বিশ্বব্যাপী শিক্ষাক্রম উন্নয়নে ব্যাপক চিনত্মা ভাবনা শুরু হয়। পঞ্চাশ দশকের শেষের দিকে মহাকাশে স্পুটনিক প্র্রেরণে রাশিয়ার অভাবনীয় সাফল্য সারা বিশ্ব জুরে বিজ্ঞান শিক্ষাক্রম উন্নয়ন, পরিমার্জন ও নবায়ন সম্পর্কে বহু চিনত্মাভাবনা ও গবেষণা করা হয়। ফলে গত চার পাঁচ দশকে শিক্ষাক্রম প্রণয়ন ও উন্নয়নের নানা তত্ত্ব মডেল, পদ্ধতি, প্রণাললী ও কলাকৌশল উদ্ভাবিত হয়। শিক্ষাক্রমের বিভিন্ন তত্ত্ব সম্বন্ধে আলোচনার আগে আমরা শিক্ষাক্রম তত্ত্ব কি জেনে নেই।

শিক্ষাক্রম তত্ত্ব ও মডেল এর ধারণাঃ

শিক্ষাক্রম হল শিক্ষাব্যবস্থার সামগ্রিক রূপরেখা। শিক্ষাক্রম শব্দটির উৎপত্তি নিয়ে কিছু মতোভেদ রয়েছে। কেউ কেউ বলেন, “Curriculum” শব্দটি ল্যাটিন শব্দ “Currere” থেকে উদ্ভুত হয়েছে। “Currere” শব্দটি প্রাচীন রোমে ব্যবহৃত হত যার অর্থ “Course of Study”, আবার কারো কারো মতে, “Curriculum” শব্দটির উদ্ভব ল্যাটিন শব্দ “Currer” থেকে যার অর্থ “ঘোড়া দৌঁড়ের পথ”  আভিধানিক অর্থে “Curriculum” হল “নির্দিষ্ট লক্ষ্যে উপনীত হওয়ার জন্য একটি কোর্স বা “A course to be run for reaching certain goal”।

Curriculum theory is a set of related statements that gives meaning to the (school) curriculum by pointing up the relationship among its elements and by directing its development, its use, and its evolution. (Beaucham-1961)

শিক্ষাক্রম মডেল ক্রমঃ

শিক্ষাক্রমের বিভিন্ন উপাদান ও এদের ক্রমবিন্যাস সম্পর্কে শিক্ষাক্রম বিশেষজ্ঞগণ একমত পোষণ করেন। শিক্ষাক্রম বিশেষজ্ঞগণের ঐক্যমতের ভিত্তিতে শিক্ষাক্রম বিকাশের মডেল ক্রম উদ্ভাব করেন। শিক্ষাক্রম মডেল ক্রমের চিত্রে দুইটি চরম প্রানত্মবিন্দু নির্দেশ করে। শিক্ষাক্রম মডেল ক্রমে অধিকাংশ বিখ্যাত শিক্ষাক্রম মডেলকে তিনটি বৃহত্তর শ্রেণিতে বিভক্ত করা হয়। এই শ্রেণিবিভাগ হল –

(১) যৌক্তিক/উদ্দেশ্য ভিত্তিক মডেল

(২) বৃত্তাকার মডেল এবং

(৩) প্রগতিশীল/মিথস্ক্রিয়া মডেল।

যৌক্তিক বা উদ্দেশ্য ভিত্তিক মডেল হল ধারাবাহিক কিন্তু অনমনীয়। অপরদিকে প্রগতিশীল বা মিথস্ক্রিয়া মডেল শিক্ষাক্রম প্রক্রিয়ার একটি নমনীয় ও পরিমার্জনযোগ্য। নিচে শিক্ষাক্রম মডেল ক্রম- এর ধারার প্রবাহ উপস্থাপন করা হল :

যৌক্তিক/উদ্দেশ্য ভিত্তিক মডেল বৃত্তাকার মডেল এবং  প্রগতিশীল/মিথস্ক্রিয়া মডেল।

  • টাইলার
  • হুইলার
  • ওয়াকার
  • তারা
  • নিকলস
  • স্কিলব্যাক

যৌক্তিক/উদ্দেশ্য ভিত্তিক মডেলঃ

ক) টাইলার তত্ত্ব : রাফ টাইলার ১৯৪৯ সালে সর্বপ্রথ শিক্ষাক্রম উন্নয়ন প্রক্রিয়ার তত্ত্ব প্রদান করেন। রাফ টাইলারের তত্ত্বটি চারধাপ বিশিষ্ট। তিনি চারটি প্রশ্নের মাধ্যমে শিক্ষাক্রম উন্নয়ন কার্যক্রম বিবৃত করা চেষ্টা করেছেন। টাইলারের চারটি প্রশ্ন শিক্ষাক্রমের সংজ্ঞায় উপস্থাপন করা হয়েছে।

 

টাইলারের তত্ত্বটিকে নিম্নরূপে উপস্থাপন করা হলো :

 

লক্ষ ও উদ্দেশ্য বিষয়বস্তু শিখন অভিজ্ঞতা সংগঠন ও বিন্যাস মূল্যায়ন

 

তিনি  শিক্ষার্থী ও তার জীবন, সমজ ব্যবস্থা, সমাজের  দর্শন, মনোবিজ্ঞান, বিষয় ইত্যাদিকে উদ্দেশ্যমূলখ উৎস হিসেবে নির্ধারণ করেন।

 

 

খ) হিলডা তাবা তত্ত্ব : হিলডা তাবা ১৯৬২ সালে শিক্ষাক্রম প্রণয়ন সম্পর্কে একটি বিশদ তত্ত্ব প্রদান করেন। এই শিক্ষাক্রম তত্ত্বের বিভিন্ন উপাদানগুলোর অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত এবং পর্যায়ক্রমে বিন্যস্ত। এটির প্রতিটি উপাদান চিন্তা প্রসূত ও ক্রমবিন্যঅস রীতিতে সাজানো। একারনে এই তত্ত্বকে শিক্ষাক্রম প্রণয়নের একটি প্রগতিশীল মডেল হিসেবে বিবেচনা করা হয়। হিলডা তাবার তত্ত্বটিকেও সাত ধাপ বিশিষ্ট তত্ত্ব হিসেবে গণ্য করা হয়। এ সাতটি ধাপ হলো:

 

১. প্রয়োজনীয়তা নিরূপণ: শিক্ষাক্রম প্রণয়ন কিংবা পরিমার্জনে প্ররম্ভিক কাজ হল বর্তমান চাহিদার প্রেক্ষাপটে প্রচলিত শিক্ষাক্রম কতটুকু পূরণ করতে পারছে তা যুক্তি সিদ্ধ পর্যবেক্ষণ ও লক্ষ্যদলের চাহিদা জরিপ করে প্রয়োজনীয়তার অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে নিরূপন করতে হয়।

২. উদ্দেশ্য নিরূপণ: যুক্তিসিদ্ধ পর্যবেক্ষণ, জরিপ এবং নিকট ও দূরবর্তী ভবিশ্যৎ অন্তদর্শন ও বর্তমান গতিধারার আলোকে সামগ্রিক অবস্থা প্রত্যক্ষণ পূর্বক শিক্ষার উদ্দেশ্য নিরূপন করতে হয়।

 

৩. বিষয়বস্তু নির্বাচন: নিরূপিত উদ্দেশ্যের প্রধান বাহন হল বিষয়বস্তু, উদ্দেশ্য অর্জন সহায়ক, পাঠদান যোগ্য বিষয়বস্তু বিশেষভাবে প্রণীত নির্ণায়কের ভিত্তিতে নির্বাচন করতে হয়।

৪. বিষয়বস্তু সংগঠন: নির্বাচিত বিষয়বস্তুসমূহকে গৃঞীত নীতি পদ্ধতির ভিত্তিতে সংগঠন করতে হয়। এরূপ সংগঠন প্রক্রিয়া / নীতি হতে পারে –

ক. জানা থেকে অজানা

খ. সহজ থেকে জটিল

গ. সমগ্র থেকে অংশ

ঘ. থিমেটিক এ্যাপ্রোচ

ঙ. সমন্বিত প্রক্রিয়া

৫. শিখন অভিজ্ঞতা নির্বাচন: নির্বাচিত ও বিন্যাসকৃত বিষয়বস্তু কোনটির মাধ্যমে কোন ধরনের শিখন অভিজ্ঞতা প্রদান করা হবে তা সনাক্তকরণ।

৬. শিখন অভিজ্ঞতা বিন্যাস: শনাক্তকৃত অভিজ্ঞতা সমূহকে একটি গ্রাহ্যনীতি অনুসরণে বিন্যাসকরণ এবং শিখন সামগ্রী রচনায় ও উপস্থাপনে তা অনুসরণের প্রচেষ্টা অভ্যাহত রাখা।

৭. মূল্যায়ণ: একদিকে প্রণীত শিখণসামগ্রী উপরের ধাপসমূহ অনুসরণে প্রণীত হয়েছে কিনা তা মূল্যায়ন করে দেখা হয়। অপরদিকে যে লক্ষ্যদলের জন্য শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করা হয়েছে তাদের উপরে প্রয়োগ করে উপযোগিতা যাচাই করে দেশব্যাপী ব্যবহারের পদক্ষেপ নিতে হয়।

যৌক্তিক মডেল: টাইলার ও তাবাঃ

যৌক্তিক মডেলের প্রবক্তা হল টাইলার ও তাবা। এই মডেল উদ্দেশ্য, বিষয়বস্ত, পদ্ধ এবং সমাপ্তিতে মূল্যায়ন এই ক্রমে উপাদানগুলো বিন্যস্ত করা হয়। উপরে প্রত্যেকটি মডেলের সংক্ষিপ্ত পরিচিত বর্ণনা করা হল। নিচে যৌক্তিক মডেলের সুবিধা ও দুর্বলতা সংক্ষেপে উপস্থিাপিত হলো:

 

যৌক্তিক মডেলের সুবিধা

 

  • যৌক্তিক মেডেল রৈখিক এবং উপাদানগুলো ধারাবাহিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
  • যৌক্তিক মডেলে শিক্ষাক্রম প্রণয়নের নির্যাস হল ব্যবহারিক অভিজ্ঞতা ভিক্তিক।
  • যৌক্তিক মডেল বর্ণিত ক্রমে শিক্ষাক্রমের উদ্দেশ্য, বিষয়বস্ত, শিখন-শেখানো।
  • এই মডেলে উদ্দেশ্যকে ভিত্তি করে অন্যান্য প্রয়োজনীয় ধাপগুলো নির্ধারণ করা হয়।
  • এই মডেলে শিক্ষাক্রমে জনগণের সমকালের চাহিদা, বিদ্যালয়ের বাইরের জনগণের জীবনধারণ ইত্যাদির যোক্তিক সমন্বয় ঘটে থাকে।
  • যৌক্তি মডেলের মাধ্যমে প্রণীত শিক্ষাক্রমে জনগণের সামগ্রিক চিন্তা চেতনার বহিঃপ্রকাশ, বাস্তব রূপ লাভ করে সামগ্রিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করা সম্ভব হয়।

 যৌক্তিক মডেলের দুর্বলতা

 যৌক্তিক/উদ্দেশ্যভিত্তিক মডেলের প্রধান দুর্বলতা হল শিক্ষাক্রম প্রণয়ন কালে শিখন-শেখানো কার্যবলি সম্পর্কে চিন্তা ভাবনা করা হয় না।

  • শিক্ষাক্রম উন্নয়ন প্রক্রিয়া অনুশীলন ও পর্যবেক্ষণ পরিলক্ষিত হয় যে শিক্ষকগণ ধারাবাহিক ও যৌক্তিক কৌশল অনুসরণ করে না।
  • যৌক্তিক মডেলের শিখন ফল নিরূপণে অতিরিক্ত গুরুত্ব প্রদানের দরুন কারেজর সমস্যা সৃষ্টি হয় বিধায় সময় বেশি লাগে।
  • উদ্দেশ্য নিরূপণে অতিরিক্ত সময় ব্যয় হওয়ার ফলে অন্যান্য উপাদান সুষ্ঠুভাবে প্রণয়নের সময় পাওয়া যায় না।
  • যৌক্তিক মডেলকে প্রায়শ সমালোচনা করা হয় কারণ এই মডেলের প্রবক্তাগণ উদ্দেশ্যের উৎস সম্পর্কে পর্যাপ্ত ব্যাখ্যা প্রদান করেন নি।

বৃত্তাকার মডেলঃ

বৃত্তাকার মডেলটি শিক্ষাক্রম মডেল ক্রমে দুই প্রান্তের মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থান করে। মূলতঃ বৃত্তাকার মডেলটি যৌক্তিক মডেলের একটি সমপ্রসারিত রূপ; কারণ এই মডেল যৌক্তিক ও ধারাবাহিক কৌশলে প্রণীত। এখানে গুরুত্বপূর্ণ হল বৃত্তাকার মডেল: শিক্ষাক্রম উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় ধারাবাহিক পরিবর্তনের মাধ্যমে শিক্ষাক্রমকে যুগের চাহিদা পূরণে সমর্থ করে সচল/গতিশীল করে তোলা। অর্থাৎ বৃত্তাকার মডেল যুক্তিযুক্তভাবে প্রয়োজনীয় দিক সংযোজন করে শিক্ষাক্রমকে সচল রাখে। ১৯৭০ সালে শিক্ষাক্রম প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় নতুন উপাদান সংযোজন করে বৃত্তাকার মডেলের উদ্ভাবন করা হয়।

পরিশেষে বলা যায় যে, বৃত্তাকার মডেল অনেকটা ক্রটিমুক্ত এবং শিক্ষার্থীর প্রয়োজনীয়তা মোটামুটিভাবে পুরণ করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে এবং তা অব্যাহত রয়েছে।

বহু বৃত্তাকার মডেলের মধ্যে নিম্নে দুইটি মডেল উপস্থাপন করা হল-কারণ গত দুইদশক ধরে এদের প্রভাব সকল ক্ষেত্রে প্রতিফলিত হচ্ছে। এছাড়া শিক্ষক শিক্ষবিদগণ এটিকে ভাল বলে মনে করেন। নিম্নে শিক্ষাক্রমের যে দুইটি যে দুইটি বৃত্তাকার মডেল সম্পর্কে আলোকপাত করা হবে সেগুলো হল: (ক) হুইলার বৃত্তাকার মডেল এবং (খ) নিকলস এন্ড নিকলস মডেল।

 

ক. হুইলার তত্ত্ব :

হুইলার মডেলটি পাঁচ ধাপ বিশিষ্ট একটিবৃত্তাকার মডেল। এই মডেলটি মূলত টাইলার মডেলের সংস্করণ। হুইলার ১৯৬৭ সালে এই বৃত্তাকার মডেলটি প্রদান করেন। নিম্নে হুইলার মডেল উপস্থাপন করা হলো:

হুইলার মডেলের ধাপসমূহ হল:

  • প্রথম ধাপে শিক্ষার ও শিক্ষাক্রমের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নিরূপণ করতে হয়।
  • দ্বিতীয় ধাপে শিখন অভিজ্ঞতাসমূহ নির্বাচন করতে হয়।
  • তৃতীয় ধাপে বিষয়বস্ত শনাক্ত/নির্বাচন করতে হয়।
  • চতুর্থ ধাপে শিখন অভিজ্ঞতা ও বিষয়বস্ত একটি নীতি অনুসনণে বিন্যস্ত করতে হয়।
  • পঞ্চম ধাপে সামগ্রিক চক্রটি মূল্যায়ন করে দেখা হয় প্রতিটি ধাপ সঠিকভাবে প্রণীত হয়েছে কি না। যদি কোনরূপ ক্রটি ধরা পড়ে তবে পুনরায় সমগ্র চক্রটি সম্পন্ন করতে হয়।

তুলনামূলক আলোচনাঃ

  1. হুইলার মডেল চক্রাকার আর টাইলার মডেল রৈখিক এবং এর উন্নয়ন প্রক্রিয়ার আরম্ভ ও শেষ আছে।
  2. হুইলার সর্বপ্রথম শিক্ষাক্রম উন্নয়ন প্রক্রিয়াকে ধারাবাহিকরূপ দান করেন।
  3. হিলডা তাবা, কার, লটনের শিক্ষাক্রম মডেল অপেক্ষা অধিকতর আধুনি তত্ত্ব।
  4. বিষয়বস্ত, শিখন অভিজ্ঞতা শনাক্তকরণ ও বিন্যাস সম্পর্কে শিক্ষাক্রমতত্ত্ববিদগণের মধ্যে মতভেদ দেখা যায়।

খ. নিকলস মডেল

এডরে এবং হাওয়ার্ড নিকলস ১৯৭৮ সালে শিক্ষাক্রম উন্নয়নের জন্য এই মডেল উদ্ভাবন করেন। নিকলস মডেলটিও বৃত্তাকার মডেল। হুইলার মডেলও বৃত্তাকার মডেল কিন্তু নিকলস মডেলে বাস্তব অবস্থা বিশ্লেষণ উপাদানটি সংযোজিত হয়েছে। নিকলস মডেল যৌক্তিক কৌশল অবলম্বন করে শিক্ষাক্রম প্রণয়ন করা হয়। AH Nicholls, টাইলার, তাবা ও হুইলারের কার্যকে পুন: সংজ্ঞয়িত করেছেন। এখানে শিক্ষাক্রম প্রণয়ন পদ্ধতি এবং বাস্তব নিকলস মডেলটি পাঁচটি উপাদান বিশিষ্ট একটি বৃত্তাকার মডেল:

বাস্তব অবস্থা বিশ্লেষণ শিক্ষাক্রম রচনাকারীর সরাসরি প্রভাব বিস্তার করে থাকে কারণ এগুলো শিক্ষার্থীর নিজ পরিবেশ থেকে সদ্য সংগৃহীত হয়েছে। বৃত্তাকার মডেলের প্রবক্তা তার পূর্ববর্তী শিক্ষাক্রম বিশেষজ্ঞগণের নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

বৃত্তাকার মডেলের সুবিধাঃ

  • বৃত্তাকার মডেলে উদ্দেশ্য ভিত্তিক মডেলের সবল দিকগুলো অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং দুর্বল দিকগুলো পরিশোধন করা হয়েছে।
  • বাস্তব অবস্থা বিশ্লেষণকে বৃত্তাকার মডেলে শিক্ষাক্রম প্রণয়নের প্রারম্ভিক কাজ/পদক্ষেপ হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। বাস্তব অবস্থা বিশ্লেষণের মাধমে প্রাপ্ত বেইজলাইন ডাটা হিসেবে গ্রহণ করে শিক্ষাক্রমের বাস্তবভিত্তিক উদ্দেশ্য নির্ধারণ করা সহজ হয়।
  • বৃত্তাকার মডেল নমনীয় মডেল নয়। তাছাড়া বাস্তব অবস্থা বিশ্লেষণ করে চাহিদা চিহ্নিত করা হয় বিধায় শিক্ষাক্রম প্রাসংগিক হয়।
  • স্কুলের চাহিদা মাফিক, বাস্তবায়নযোগ্য শিক্ষাক্রম প্রণয়নে বৃত্তাকার মডেলের ব্যবহার সর্বাধিক।

বৃত্তাকার মডেলের দুর্বলতাঃ

  • বৃত্তাকার মডেলের সহজাত দুর্বলতা হল কোন কার্যে ক্রটি রয়েছে তা নিরূপণ করা কঠিন।
  • অনেকেই বলে থাকেন যে, আপাততভাবে এই মডেল যৌক্তিক ও ধারাবাহিক এটি তার একটি দুর্বলতা।
  • এই মডেলের মৌলিক সমস্যা তার বাস্তবায়নে যেখানে প্রচুর সময়ের ও জনবলের দরকার তা নানা সীমাবদ্ধতার কারণে সম্ভব হয় না।

প্রগতিশীল/মিথস্ক্রিয়া মডেলঃ

প্রগতিশীল/মিথস্ক্রিয়া মডেল শিক্ষাক্রম প্রণয়নের বিকল্প কৌশল হিসেবে উদ্ভাবন করা হয়েছে। ওয়াকার (Walker) ১৯৭১, স্কীল ব্যাক (Skilback) ১৯৭৬, ম্যাক ডোনাল্ড (Mc-Donald) এবং পার্পল (Pupral) ১৯৮৮ এই ব্যক্তিক্রয়ের প্রচেষ্টায় মিথস্ক্রিয়া/প্রগতিশীল মডেলের প্রবক্তা। এই মডেল উদ্ভাবনের পশ্চাতে প্রবক্তাগণের যুক্তি হল, পূর্ববর্তী মডেল দুইটিতে শিক্ষাক্রম উন্নয়ন প্রক্রিয়া রৈখিক ও লাগাতারে ধারাবাহিক নয় এবং একটি উপাদান সম্পাদনের শেষে পরবর্তী উপাদানের কাজে হাত দেওয়া হয়। এই মডেলে শিক্ষার্থীর চাহিদাকে যথাযথ গুরুত্ব প্রদান পূর্বক শিক্ষাক্রম পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হয়।মিথস্ক্রিয়া বা প্রগতিশীল মডেলের তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল-এটি বিশ্লেষণধর্মী ও বর্ণনামূলকক্রিয়া। বহুদেশে বহু বিশেষজ্ঞ এবং প্রতিষ্ঠান এই মডেল নিয়ে নানা প্রেক্ষাপটে ব্যাখ্যা ও প্রয়োগ করে সুফল লাভ করেছে। যে সকল বিশেষজ্ঞ এই মডেল নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করেছেন এবং প্রয়োগে সুফল লাভ করেছেন তন্মধ্যে Deeker Walker এবং Malcolm Skilbeck এই দুইজন বিশেষজ্ঞের অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং জনপ্রিয়।

[[

 

ক. ডেকার ওয়াকার মডেল

সত্তর দশকের গোড়ার দিকে ওয়াকার যৌক্তিক মডেল সম্বন্ধীয় সাহিত্য পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে জানান যে, যৌক্তিক মডেল জনপ্রিয় কিংবা সফল নয়। এছাড়া এই মডেল ব্যবহারকারীরা পরবর্তীতে এটি ব্যবহারের জন্য অভিমত প্রদান করেন নি। কারণ তাঁরা জানান যে, ওয়াকার মডেল তিনস্তর বিশিষ্ট এবং এটি ব্যবহারে সময় ও জনবল কম লাগে। নিচে ওয়াকার মডেলের কাঠামো চিত্রের

 

মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:

  • মঞ্চের আওতাভুক্ত ধারণা, দৃষ্টিভঙ্গি, বিশ্বাস, মূল্যকে শিক্ষাক্রম প্রণয়নের ভিত্তি হিসেবে গ্রহণ করা হয়।
  • ওয়াকারের মতে শিক্ষাক্রম মঞ্চে ধারণা ইত্যাদি শিক্ষাক্রম প্রণয়নকারী শিক্ষাক্রম সম্পর্কে সামগ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি ও প্রসারিত দৃষ্টি সম্পর্কে নির্দেশনা দেয়।
  • দ্বিতীয় স্তরে শিক্ষাক্রমের উদ্দেশ্য, ব্যবহারকারী ইত্যাদির সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে প্রণীত শিক্ষাক্রম পরিমার্জন সংশোধন কিংবা পরিবর্তন এমনটি প্রয়োজনে কিছুদিক অভিযোজন করে গ্রহণযোগ্যতার মাত্রা বৃদ্ধি করা।
  • ওয়াকার মডেলের চুড়ান্ত পর্যায় হল ডিজাইন। এই পর্যায়ে শিক্ষাক্রম প্রণয়নকারী শিক্ষক্রম প্রক্রিয়ার বিভিন্ন উপাদান সম্পর্কে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। তবে ব্যাপক (সামষ্টিক ও ব্যক্তিক) আলোচনার ভিত্তিতে চূড়ান্ত করা হয়। এই চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে শিক্ষাক্রমের শিখন সামগ্রীসহ অন্যান্য উপাদান লিপিবদ্ধ করা হয়।

খ. ম্যালকম স্কীলব্যাক মডেল

অষ্ট্রেলিয়ার শিক্ষাক্রম উন্নয়ন কেন্দ্রের পরিচালক ম্যালকম স্কীলব্যাক (১৯৭৬) শিক্ষাক্রম প্রণয়নের জন্য মিথস্ক্রিয়া/প্রগতিশীল মডেলের প্রবক্তা। স্কিলব্যাক মডেল প্রণয়ন কৌশল স্কুল ভিত্তিক শিক্ষাক্রমে উন্নয়নের [ School Based Curriculum Development (SBCD] জন্য অধিক কার্যকর বলে তিনি সুপারিশ করেন। মিথস্ক্রিয়া মডেল আপাতদৃষ্টিতে যৌক্তিক বিন্যাস প্রতিয়মান হলেও কিন্ত আসলে এটি প্রগতিশীল মডেল। ম্যালকম এর মতে মিথস্ক্রিয়া মডেল পাঁচধাপ বিশিষ্ট মডেল।

শিক্ষাক্রম প্রক্রিয়ায় স্কিলব্যাক মডেল নিম্নরূপ:

স্কীলব্যাক এর মতে, মডেলের রূপরেখা পূর্ব নির্ধারিত নয় বরং উপায় বিশ্লেষণ/শিক্ষাক্রম প্রক্রিয়ার বিভিন্ন উপাদান বা ধাপের কার্যাদি সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা লাভ করা। ম্যালকম স্কীলব্যাক মডেলের বৈশিষ্ট্য নিম্নে পর্যায়ক্রমে সংক্ষেপে বর্ণিত হল।

১. বাস্তক অবস্থা বিশ্লেষণ (Situation Analysis)

পরিবর্তিত অবস্থা পর্যালোচনা: যে সব উপদান নিয়ে বাস্তব অবস্থা গঠিত সেগুলো বিশ্লেষণ করা।

ক. বাহ্যিক (External)

  1. কৃষ্টি ও সমাজের পরিবর্তন ও অভিভাবকগণের প্রত্যাশা/ নিয়োগকারীর প্রয়োজনীয়তা, সমাজের প্রচলিত মুল্যবোধ ইত্যাদি।
  2. শিক্ষাব্যবস্থার চাহিদা-নীতি, পরীক্ষা, স্থানীয় প্রত্যাশা ইত্যাদি বিবেচনা।
  3. বিষয়বস্ত, শিখন-শেকানো প্রক্রিয়ার বৈশিষ্ট্যগত পরিবর্তন।
  4. শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও গবেষণার ফলাফল প্রয়োগ।
  5. বিদ্যালয়ে সম্পদ যোগানের অব্যাহত ধারা।

খ. অভ্যন্তরীণ (Internal)

  1. শিক্ষার্থীর প্রবণতা ও সামর্থ্য অনুসারে শিখন প্রয়োজনীয়তা নিরূপণ।
  2. শিক্ষকের জ্ঞান, দক্ষতা, অভিজ্ঞতা এবং সবল ও দুর্বল দিক সম্পর্কে  সামগ্রিক ধারণা।
  3. বিদ্যালয়ের বৈশিষ্ট্য, কার্যভার বিভাজন, সংশ্লিষ্ট সকলের সঙ্গে সম্পর্ক ইত্যাদি।
  4. সম্পদ, কার্যক্রম, যন্ত্রপাতি ইত্যাদির যোগান।
  5. প্রচলিত শিক্ষাক্রমের সমস্যা ও সীমাবদ্ধতা ইত্যাদি।

২. লক্ষ্য নির্ধারণ (Goal formulation)-

লক্ষ্যে, শিক্ষক ও মিক্ষার্থীর কার্যদি শিখনফল হিসেবে বিবৃত থাকতে হবে। লক্ষ্য অবশ্যই বাস্তব, বিশ্লেষণের ফলাফল ভিত্তিক হবে। শিক্ষা কার্যক্রম কোন দিকে পরিচালিত হবে তা সমাজ ও দেশের বর্তমান মূল্যবোধ, শিক্ষাব্যবস্থা ও ন্যায় বিচারের অনুকুল হতে হবে।

৩. কার্যক্রম নির্মাণ/ প্রণয়ন (Program Building)

ক. শিখন-শেখানো কার্যাবলির ডিজাইন: বিষয়বস্তু, কাঠামো এবং শিক্ষাদান পদ্ধতি, পরিসর ও ধারাবাহিকতা।

খ. শিখন সামগ্রী: সম্পদ, পাঠ্যপুস্তক, শিক্ষা উপকরণ ইত্যাদি।

গ. শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের কাঠামো: প্রতিষ্ঠান স্থাপনের ডিজাইন, পরীক্ষাগার, বিদ্যালয়ের বাইরের কাজ, শিক্ষামূলক ভ্রমণ ইত্যাদি।

ঘ. সামাজিক পরিবর্তনের প্রতিফলন অবশ্যই ঘটবে শিক্ষাক্রমে।

ঙ. বিদ্যালয়ের কময় ও কার্য তালিকা।

 ৪. বিশদীকরণ/স্পষ্টীকরণ ওবাস্তবায়ন (Interpretation and Implementation)

পরিবর্তিত শিক্ষাক্রম বাস্তবায়নে কিছু সমস্যা দেখা দেয় যেমন-নবীন ও প্রবীনদের মধ্যে বাধার সৃষ্টি হয়, এই বাধাবিপত্তি, বিশ্লেষণপূর্বক অতীত অভিজ্ঞতার তা উত্তরণের ব্যবস্থা করতে হয়।

 ৫.পরীবিক্ষণ, ফিডব্যাক, নির্ণীত পরিমাপ ও পুনর্নির্মাণ

উপরিউক্ত কাজগুলো সুষ্ঠুভাবে সম্পন্নকরণের জন্য নিম্নোক্ত উপায়ে কার্য সম্পাদন করতে হয়:

  • পরীবিক্ষণের যোগাযোগ ব্যবস্থান ডিজাইন প্রণয়ন করতে হয়।
  • পরিমাপের জন্য সিডিউল প্রণয়ন করা।
  • ধারাবাহিক পরিমাপের সমস্যা চিহ্নিতকরণ।
  • অগ্রগতির ধারাবাহিকতার প্রণীত র্কাক্রমকে পূননির্মান করতে হয়।

শিক্ষাক্রম তত্ত্ব ও মডেল এর রূপান্তরঃ

শিক্ষাক্রম উন্নয়নকারী প্রতিষ্ঠান মৌলিক ও ফলিত গবেষণান ফলাফলের ভিত্তিতে শিক্ষাক্রম উন্নয়ন করে থাকে। শিক্ষাক্রমের বিষয়বস্তু ও শিখন উপকরণ তৈরীর পর নমুনা লক্ষ্যদলে প্রয়োগকরে  এর উপযোগিতা ও কার্যকারিতা যাচাই করা হয়। যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে রচিত শিখন উপকরণের প্রয়োজনীয় পরিমার্জণ ও সংশোধন করা হয়। এই সংশোধিত শিখন উপকরণ দেশব্যপী ব্যবহারের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক মুদ্রন করা হয়। মুদ্রিতশিখন উপকরণ বিস্তরনের জন্য সংশ্লিষ্ট সকলকে প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্যে বিশদ পরিকল্পনা প্রণয়ন এবং তদানুসারে প্রশিক্ষণ প্রদান করার পর দেশ ব্যাপী প্রবর্তন কার হয়।

গবেষণা, উন্নায়ন ও পরিব্যাপ্তি মডেলঃ

গবেষণা, উন্নায়ন ও পরিব্যাপ্তি মডেলের উলেস্নখযোগ্য বেশিষ্ট্য হলো:                 

  • আধুনিক ও ধারাবাহিক
  • গবেষনাভিত্তিক ও সুপরিকল্পিত:
  • প্রতিটি ধাপের কাজ সুনির্দিষ্ট অথচ সমন্বিত এবং
  • দীর্ঘমেয়াদী ও ব্যয়সাপেড়্গ।

 গবেষণা, উন্নায়ন ও পরিব্যাপ্তি মডেলের সুবিধা:

  • বৈজ্ঞানিক পদ্দতি প্রয়োগের মাধ্যমে এর প্রয়োজনীয়তা নিরম্নপন করা হয়।
  • শিক্ষাক্রম বিশেষজ্ঞগণ এটি প্রণয়ন করেন।
  • প্রতি ধাপের গুনগতমান মূল্যায়নের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়ে থাকে।
  • দেশব্যাপী ব্যবহারের পূর্বে উপযোগিতা যাচাই করা হয়।
  • ব্যাপক ব্যবহারের জন্য সংশিস্নস্ট সকলকে প্রশিড়্গণ দানের মাধ্যমে প্রস্তুত করা।

গবেষণা, উন্নায়ন ও পরিব্যাপ্তি মডেলে প্রারম্ভিক পর্যয়ে শিড়্গকগণের ব্যাপক সংশিস্নষ্টতা থাকে না এবং এতে ভৌগোলিক ও আঞ্চলিক চাহিদার পুরোপুরি প্রতিফলন কোন কোন ড়্গেত্রে সম্ভব হয় না।

সামাজিক মিথস্ক্রিয়া মডেল

এই মডেল শিড়্গাক্রম পরিকল্পনা এবং পরবর্তী সকল কার্য সম্পাদনে সমাজের সকল শ্রেণীর লোকের মতামত গ্রহন করা হয়। অর্থাৎ উদ্দেশ্য নিরম্নপণ থেকে শুরম্ন করে বাসত্মবায়ানের শেষ ধাপ পর্যনত্ম সকলবে অবহিত করা হয়। সমাজের সকল সত্মরের পেশাজীবীর অভিমত গ্রহন এবং প্রয়োজনে সংসিস্নস্ট ব্যক্তিবর্গকে প্রশিড়্গণ প্রদান করা হয়। শিড়্গাক্রম উন্নায়ন সম্পর্কে প্রচার মাধ্যমে সকলকে অবহিত করা এবং তাদের পরামর্শ ও যথাযথভাবে বিশেস্নণের মাধ্যমে গ্রহন করা হয়। এই মডেলকে শিড়্গাক্রমের বিভিন্ন কার্যাক্রম সম্পর্কে অবহিতকরণ মডেলও বলা যেতে পারে।

হেভলকের সামাজিক মিথস্ক্রিয়া মডেলটি বোঝার সুবিধার্থে (কেন্দ্রীয় বিষয় ঠিক রেখে) নিন্ম আকারে উপস্থাপন করা হলো:

মিথস্ক্রিয়া মডেল অনুসরণে শিক্ষাক্রম উন্নয়নে নিন্মোক্ত ধাপ অনুসৃত হয়:

  • প্রথমত গবেষণা প্রতিষ্ঠানসমুহকে সংগঠন করা হয়। অত:পর ব্যাপক জনগোষ্ঠীর নিকট থেকে শিড়্গার প্রয়োজনীয়তা, শিখনের নবতর বিষয়বস্তু ইত্যাদি সম্পর্কে যথাযথ উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়।
  • দ্বিতীয় সংগৃহীত তথ্যের সারবস্তুু সর্বসত্মরের জনসভায় উপস্থাপন, আলোচনার পর সর্বসম্মতি ক্রমে গৃহিত শিক্ষাক্রম এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় উপকরনাদী চূড়ান্তকরণ ও সংশিস্নষ্ট ব্যক্তি/কর্মকর্তার প্রশিক্ষন সমাপন করা হয়।
  • সবশেষে চূড়ান্ত শিক্ষক্রম দেশব্যাপী ব্যবহারের জন্য প্রবর্তন করা হয়।

সামাজিক মিথস্ক্রিয়া মডেলের সুবিধা

১. এই মডেল শিক্ষাক্রম উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি নমনীয়।

২. তৃণমূল পর্যায় থেকে প্রয়োজনীয়তা চিহ্নিত করা যায় তাই বাসত্মবায়নে সংশিস্নষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান স্বেচ্ছায় সম্পৃক্ত হয়।

৩.তাত্তিক অপেক্ষা ব্যবহারিক দিকে অধিক গুরত্ব দেওয়া হয়।

৪.বাস্তবায়নে অর্থের ব্যয় তুলনামূলকভাবে কম হয়।

সামাজিক মিথস্ক্রিয়া মডেলের অসুবিধা

  1. এই মডেল নমণীয় বলে সময় বেশী লাগে।
  2. গুনগত দিক অপেক্ষা পরিমাণগত দিকে অধিক প্রধান্য পায়।
  3. বাস্তবায়নে সব খুটিনাটি দিকে সমার গুরুত্ব দেওয়া সম্ভব হয় না।

গ. সমস্যা সমাধান মডেল

শিক্ষাব্যবস্থাকে সচল রাখার জন্য শিক্ষাক্রমকে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নবায়ন করতে হয়। তাই শিক্ষাক্রমকে একটি ধারাবহিক পরিবর্তনশীল পদ্ধতি বলা হয়ে থাকে।

সমস্যা সমাধান পদ্দতি হলোঃ

পর্যবেড়্গণ পরীবিড়্গনের মাধ্যমে কোন নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিক প্রক্রিয়া অনুসরণে কোন কাজ করাকে বলা হয় সমস্যা সমাধান পদ্দতি । সমস্যা সমাধান পদ্দতি আবার বৈজ্ঞানিক পদ্দতি নামেও পরিচিত। কারন এ পদ্দতিতে একটি সুনির্দিষ্ট সমস্যা চিহ্নিত করে তা সমাধানের জন্য ধারাবাহিকভাবে প্রচেষ্টা চালানো হয়।

সমস্যা সমাধানের মডেলের প্রধান ধাপগুলো হলোঃ

  1. প্রায়োজনীতা অনুভব করা
  2. সমস্যার লঙ্গন বা ধরন নিরূপন
  3. অনুসন্দান চালানে
  4. সমস্যার প্রতিকার
  5. সম্ভব্য সমাধান চিহ্নিতকরন
  6. প্রয়োগ করে সঠিক সমাধানের উপায় খুঁজে বের করা।

কার্য সম্পাদনে প্রক্রিয়াঃ

  1. সমস্যা সমাধানের প্রয়োজনীয়তাকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিক কার্যক্রম গ্রহন করতে হয়।
  2. এই প্রয়োজনীয়তাকে সমস্যায় রূপানত্মর করার পর এর লক্ষণগুলো নিরূপণ করা হয়।
  3. অনুসন্দানের মধ্যমে সমস্যা সমাধানের কার্যকর উপায় উদ্ভাবন করা হয়।
  4. উদ্ভাবিত সমাদধানের উপায়গুলোকে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে প্রয়োগ করে সর্বোত্তম উপায়টি চিহ্নিত করতে হবে।
  5. শনাক্তকৃত উৎকৃষ্ট উপায়টি দেশব্যাপী ব্যাহার করতে হয়।

সমস্যা সমাধান মডেলের বৈশিষ্ট্য হলো :

  1. লক্ষ্যদলের প্রয়োজনীয়তা সর্বাগ্রে বিবেচনা হয়।
  2. সমস্যার প্রকৃতি লড়্গন নিরম্নপন সমস্যা সমাধান প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ।
  3. সমস্যা সমাধানে বাহ্যিক প্রভাবগুলোর কোন দিক নির্দেশনা থাকে না বিধায় এগুলোকে বিচার বিশ্লেষণের পর গ্রহন করা হয়।
  4. অভ্যনত্মরীণভাবে প্রাপ্ত সম্পদগুলোকে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করতে হয়, কারন এগুলো সহজলভ্য ও প্রয়োগযোগ্য।
  5. স্ব-উদ্যোগে ও প্রচেষ্টার মাধ্যমে উদ্ভাবন করা হয় বলে উদ্ভাবন কারীকে আত্নবিশ্বসী করে তোলে । ফলে এই প্রক্রিয়াটি স্থিতিশীলরূপে লাভ করে।

হেভলক তার তিনটি মডেল সংযোজন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমন্বয় সাধন করেছেন।

বর্তমানে এর সার্বিক কাজঃ

শিক্ষাক্রম নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোড়ন সৃষ্টি হয় মূলত আমেরিকায়। সেখানে আধুনিক কালের মত শিক্ষাক্রমের বহুল ব্যবহার দেখা যায় ১৮২০ সাল থেকেই। তবে তখনও শিক্ষাক্রমের ধারনা ততটা সংকীর্ণতামুক্ত হতে পারেনি। তখন শিক্ষাক্রম বলতে বোঝান হত “Course of Study” কে। শিক্ষাক্রমকে পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তু, কোর্স সীমারেখা, শিক্ষক নির্দেশিকা বা Product হিসেবে দেখা হত। এই ধারনায় শিক্ষাক্রমের ব্যাপক ব্যবহার দেখা যায় ১৯৩০ সাল পর্যন্ত। এসময় শিক্ষকগণ শিক্ষাক্রমকে পাঠ্যবিষয়ের তালিকা হিসেবে নির্দিষ্ট সময় পর পর শ্রেণীতে পাঠদানের জন্য ব্যবহার করতেন এবং শিক্ষার্থীরা তা গ্রহন করতো।

ইরাট ইটাল মডেল

শিক্ষাবিদ ইরাট তার গবেষনা দলের সহায়তায় ১৯৭৫ সালে শিক্ষাক্রম উন্নায়নে এই মডেল উদ্ভাবন করেন। ইরাট শিক্ষাক্রম উন্নয়ন মডেল রৈখিক ও আবর্তনশীল উভয় বৈশিষ্ট্য সমন্বয়ে গঠিত। সাসেক্র বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম শিক্ষাক্রম বিশ্লেষনে এই মডেল প্রয়োগ করে সফল লাভের পর ইউরোপের অধিকাংশ দেশে শিড়্গাক্রম উন্নয়নে এই মডেল ব্যবহৃত হচ্ছে।

ইরাট শিক্ষাক্রমের প্রতিটি উপাদান আবর্তনশীলক্রমে এবং রৈখিকক্রমে শিড়্গার লক্ষের আলোকে মূল্যায়ন করা যায়। ইরাট মডেল শিড়্গার লড়্গ হল কেন্দ্রীয় বিষয় যা শিড়্গাক্রম উন্নায়নে প্রধান ধাপগুলোকে প্রভাবিত করে। যেমন- শিড়্গার লক্ষ হতে শিক্ষার উদ্দেশ্য নিরূপন, বিষয়বস্তু চয়ন, উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য শিখন পদ্ধতি, শিক্ষার্থী শিখন অগ্রগতি পরিমাপ ইত্যদি।

তাছাড়া ইরাট মডেল প্রয়োগ করে শিড়্গাক্রম মূল্যায়ন করলে শিক্ষাক্রমের সব ধাপগুলো নিখুঁতভাবে মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়।

এনসিটিবি মডেল

রাষ্ট্রীয় আদর্শ, জাতীয় লক্ষ্য, সমকলীন জীবনের চাহিদা এবং চলমান বিশ্বে জ্ঞান বিজ্ঞানের অগ্রগতির আলোকে শিক্ষাক্রম এ পাঠ্যসূচীর পরিবর্তণ, পরিমার্জন ও নবায়ন যে কোন শিক্ষা ব্যবস্থার গতি সঞ্চারের জন্য অপরিহার্য। বস্তুত শিক্ষাক্রম উন্নয়ন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ক্রমবিকাশের প্রেক্ষিতে এ প্রক্রিয়াও অব্যাহত থাকে। এই পটভুমিকে এনসিটিবি এর শিক্ষাক্রম শাখা ধারাবাহিকভাবে তার ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

শিক্ষাক্রম শাখার বর্তমান কার্যাবলি

এনসিটিবি এর শিক্ষাক্রম শাখা শিক্ষাক্রম পরিমার্জন নবায়ন প্রক্রিয়ার মডেলটি হল রৈখিকভাবে সাজানো

লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য নির্ধারণ -> বিষয়বস্তু চয়ন -> শিক্ষণ সামগ্রী প্রণয়ন ও শিক্ষক প্রশিক্ষণ -> মূল্যায়ন

এনসিটিবি এর মডেলটি হুইলার মডেলের ন্যায় । হুইলার মডেল পাঁচ ধাপ বিশিষ্ট আর এনসিটিবি এর মডেল চার ধাপ বিশিষ্ট।

উপরে বণিত মডেলের মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতার ভিত্তিতে দেশের শিক্ষাব্যবস্থা মানব সম্পদ ব্যবহারের দরুন, সমকালীন জীবনের চাহিদা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির প্রয়োগ ইত্যাদির উপর সচেতন দৃষ্টি রেখে শিক্ষাক্রমের ডিজাইন ও পরিকল্পনা  তৈরী করতে হয়।

পরিশেষে, শিক্ষাক্রম উন্নয়নের তত্ত্ব প্রদানের মধ্যেই শিক্ষাবিজ্ঞানীদের অবদান সীমাবদ্ধ নয়। এই তত্ত্ব  বিশ্লেষণ করে আমাদের উদ্দেশ্যভিত্তিক শিক্ষাক্রম উন্নয়নের দিক নির্দেশনা প্রদান করেছেন এবং সাথে সাথে উদ্দেশ্যের উৎসও চিহ্নিত করেছেন। উদ্দেশ্য নির্ণয়ের পর বিষয়বস্তু নির্বাচন করা, নির্বাচিত বিষয়বস্তুর মাধ্যমে উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য বিষয়বস্তুকে সংগঠন করা এবং সর্বশেষে মূল্যায়ন করে দেখা উদ্দেশ্যবলী কতটা নির্ণয়ের মাধ্যমে শিক্ষাক্রম উন্নয়ন প্রক্রিয়া আরম্ভ এবং মূল্যায়নের মাধ্যমেত তার সমাপ্তি। বস্তুত শিক্ষাক্রম উন্নয়ন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া। দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার ক্রমবিকাশের প্রেক্ষিতে এ প্রক্রিয়াও অব্যাহত থাকে। এই পটভুমিকে এনসিটিবি এর শিক্ষাক্রম শাখা ধারাবাহিকভাবে তার ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে।

LEAVE A RESPONSE

Your email address will not be published. Required fields are marked *