সৈয়দ মাহবুব হাসান আমিরী

আইসিটি বিভাগ, ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজ

মুক্তিযুদ্ধ

মেজর (অবঃ) ওয়াকার হাসান, বীর প্রতীক

ওয়াকার হাসান বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। স্বাধীনতা যুদ্ধে তার সাহসিকতার জন্য বাংলাদেশ সরকার তাকে বীর প্রতীক খেতাব প্রদান করে।ওয়াকার হাসান ১৯৭১ সালে রাজশাহী প্রকৌশল কলেজের প্রথম বর্ষের ছাত্র ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ৯ এপ্রিল তিনি মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। পরে ভারতে পালিয়ে গিয়ে প্রাথমিক প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর তিনি প্রথম বাংলাদেশ কমিশন্ড অফিসার্স ওয়ারফোর্সে যোগ দেন। প্রশিক্ষণ শেষে তাকে জেড ফোর্সের প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্টে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তিনি বৃহত্তর সিলেটের শ্রীমঙ্গল, পাট্টাখোলা, হোসনাবাদ, চারগ্রাম, এমসি কলেজসহ বেশ কয়েকটি স্থানে সশস্ত্র যুদ্ধ করেন।১৬ এপ্রিল ১৯৭১। সিলেটের তেলিয়াপাড়ার ‘মনতলী’ চা বাগান। সন্ধ্যার দিকে পাহাড়ের পাদদেশে পাকিস্তানিদের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে (রেকি) ব্যস্ত সদ্য কৈশোরোত্তীর্ণ তিন মুক্তিযোদ্ধা। সুনসান নীরবতা, যতদূর চোখ যায়, কোথাও দেখা নেই পাকিস্তানিদের। কিছুটা নির্ভার তিন যোদ্ধা এবার রাস্তা ধরে হাঁটছেন। কিন্তু আচমকা পাহাড়ের বাঁক ঘুরে তারা কয়েকজন পাকিস্তানি সেনার মুখোমুখি হয়ে পড়েন। দৌড়ে চা বাগানের নালায় আশ্রয় নিলেন তারা। পাকিস্তানিদের বুটের স্পষ্ট আওয়াজ আশপাশে। ভয়ে আত্মাছাড়া অবস্থা তাদের। অথচ ১০ দিনের ব্যবধানে মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে পাকিস্তানিরা আক্রমণ চালালে তেলিয়াপাড়ায় প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন ওই তিন মুক্তিযোদ্ধার একজন ওয়াকার হাসান। যিনি স্বাধীনতা যুদ্ধে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে পরে বীরপ্রতীক খেতাবে ভূষিত হন।স্বাধীনতার এতো বছর পর তেলিয়াপাড়ার মনতলীতে পাকিস্তানিদের রেকি করার সেই দিনের স্মৃতিচারণ করে মেজর (অব.) ওয়াকার হাসান বলেন, কোম্পানি কমান্ডারের নির্দেশে আমরা তিনজন ওইদিন পাকিস্তানিদের গতিবিধি রেকি করতে মনতলী চা বাগানে গিয়েছিলাম। সঙ্গে ছিলেন ডা. এম এ হাসান (বর্তমানে ওয়ার ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটির সভাপতি) ও ওয়ারেছ (যুদ্ধের পর মাত্র একবার গুলিস্তানে দেখা হয়েছিল তার সঙ্গে)। আমরা যখন পাকিস্তানিদের মুখোমুখি হয়ে পড়ি তখন ভয়ে আত্মাছাড়া অবস্থা। কাছেই বুটের স্পষ্ট আওয়াজ পাচ্ছিলাম। সেখানে কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পর পাকিস্তানিরা আছে কি-না সেটা যাচাই করতে আমাদের একজন একটু দূরে কয়েকটি ঢিলও ছোড়ে। উদ্দেশ্য ছিল পাকিস্তানিরা থাকলে অবশ্যই যেখানে ঢিল পড়বে, সেখানে গুলি ছুঁড়বে। পাকিস্তানিদের কোনো সাড়া নেই দেখে আমরা আবারও রেকি করতে বের হলাম এবং পাকিস্তানিদের অবস্থান জেনে ক্যাম্পে ফিরে গেলাম। এর পরও পাকিস্তানিরা আমাদের অবস্থান জেনে গিয়েছিল। ২৭ এপ্রিল পাকিস্তানিরা তেলিয়াপাড়ায় মুক্তিবাহিনীর ক্যাম্পে আক্রমণ করে। ভোর ৪টা থেকে দুই ঘণ্টা ব্যাপক যুদ্ধ হয়। আমার নেতৃত্বে ছিল ৪০ জনের একটি প্লাটুন। পাকিস্তানিরা ‘ইয়া আলি’ স্লোগান দিয়ে গুলি করত; আমরাও উল্টো দিক থেকে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে পাল্টা গুলি করতাম। এক পর্যায়ে পাকিস্তানিরা পিছু হটে যেতে বাধ্য হয়। যদিও বেশিদিন আমরা তেলিয়াপাড়ায় নিজেদের অবস্থান সুসংহত রাখতে পারিনি। কারণ দু’তিন দিনের মাথায় পাকিস্তানিরা সংঘবদ্ধ হয়ে ফের আমাদের ওপর আক্রমণ চালায়। বাধ্য হয়ে মে মাসের প্রথম সপ্তাহে আমরা তেলিয়াপাড়া দখল ছেড়ে ভারতের ত্রিপুরার সিমনা ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছিলাম। আমাদের ক্যাম্পের নেতৃত্বে ছিলেন মুক্তিযুদ্ধে ৩ নম্বর সেক্টর কমান্ডার কে এম সফিউল্লাহ (স্বাধীন দেশের সেনাবাহিনীর প্রথম প্রধান)। সেখানে কয়েকদিন অবস্থানের পর বাছাই করা দেড়শ’জনের একটি দলকে সফিউল্লাহ সাহেব সীমান্তবর্তী ‘মনতলী ক্যাম্পে’ পাঠান। ওই দলের হয়ে আমরা সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোতে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ করতে থাকি। এরপর ২৬ জুন আমাদের ৬১ জনকে বাছাই করে শিলিগুড়ির কাছে ‘মূর্তি ক্যাম্পে’ পাঠানো হয়। ৯ অক্টোবর পর্যন্ত প্রশিক্ষণ চলে। প্রশিক্ষণ শেষে ১১ অক্টোবর আমাকে জেড ফোর্সের প্রথম বেঙ্গল রেজিমেন্টে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বৃহত্তর সিলেটের শ্রীমঙ্গল, পাট্টাখোলা, হোসনাবাদ, চারগ্রাম, এমসি কলেজসহ ১২টি স্থানে সশস্ত্র যুদ্ধ করেন ওয়াকার হাসান। মুক্তিবাহিনীর ডেলটা কোম্পানির ১২ নম্বর প্লাটুনের কমান্ডার ছিলেন তিনি। এর মধ্যে একাত্তরের ২৬ নভেম্বর সিলেটের কানাইঘাট এলাকায় বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য তাকে বীরপ্রতীক খেতাবে ভূষিত করা হয়। ওই যুদ্ধে পাকিস্তানের পাঞ্জাব রেজিমেন্টের ৮৮ সেনা নিহত এবং ২৬ জন বন্দি হয়েছিল। কানাইঘাটের সেই যুদ্ধের কথা বলতে গিয়ে ওয়াকার হাসান বলেন, তখন ছিল শীতকাল। ২১ নভেম্বর ঈদের দিন সকালে নামাজ শেষে সাড়ে ৮টার দিকে আমরা জালালপুর সীমান্ত দিয়ে দেশে প্রবেশ করেছিলাম। এরপর কয়েকদিন জকিগঞ্জ, কানাইঘাটের চারপাশে গৌরীপুর, বড় চাতাল, ডালিয়ার চরসহ কয়েকটি গ্রামে পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমাদের খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ হয়েছিল। তখন গৌরীপুরের একটি ভয়াবহ যুদ্ধে ২০-২৫ জন পাকিস্তানি সেনা নিহত হলে ২৬ নভেম্বর কানাইঘাটে পাকিস্তানিরা সংঘবদ্ধ হয় এবং আনুমানিক ভোর সাড়ে ৪টা বা ৫টার দিকে আমাদের ওপর পাল্টা আক্রমণ চালায়। অতর্কিত আক্রমণে প্রায় বিধ্বস্ত হয়ে যায় সুবেদার মুসার নেতৃত্বাধীন মুক্তিবাহিনীর ১১ নম্বর প্লাটুন। ওই প্লাটুনের বাঁ দিকে কয়েকশ’ মিটার দূরেই অবস্থান ছিল আমার (ওয়াকার) নেতৃত্বাধীন ১২ প্লাটুনের। ওয়্যারলেসে পাকিস্তানিদের আক্রমণের খবর পাওয়ার পর ৪০ জনের একটি দল নিয়ে ঝড়গতিতে ১১ নম্বর প্লাটুনের অবস্থানে এসে পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলাম। শুরু হয় উভয়পক্ষের সম্মুখ যুদ্ধ। কয়েক ঘণ্টা ধরে চলে এ যুদ্ধ। এক পর্যায়ে পাকিস্তানি সেনারা যখন ব্যাপক হারে নিহত বা আহত হচ্ছিল, তখন তারা পালাতে থাকে। পালানোর সময় ৩১ পাঞ্জাব রেজিমেন্টের মেজর সারওয়ার নিহত হয়। শুধু সারওয়ার নয়, ওই যুদ্ধে আরও ৮৭ পাকিস্তানি সৈন্য নিহত হয়েছিল। বন্দি হয় ২৬ পাকিস্তানি সৈন্য। এভাবেই টানা যুদ্ধের মধ্যে দিয়ে অবশেষে একাত্তরের ১৫ ডিসেম্বর মুক্তিবাহিনীর কাছে আত্মসমর্পণ করে পাকিস্তানিরা।ওয়াকার হাসানের জন্ম ঢাকায়। ওয়াকার হাসানের পৈতৃক নিবাস ঢাকার শ্যামলীর ৯ নম্বর রিং রোডে। তার বাবার নাম এ এইচ এম হাবিবুল ইসলাম। মা শামসুন নাহার। স্ত্রী মাহমুদা আক্তার। তাদের দুই মেয়ে ও এক ছেলে।

সূত্র: উইকিপিডিয়া, বিভিন্ন দৈনিক পত্রিকা